মেনোপজে হাড় ক্ষয় আর নয়, আসুন সচেতন হই

প্রথমেই একটা কথা জেনে রাখা উচিত, মেনোপজ কোন রোগ বা সমস্যা নয়। এটি নারী জীবনের একটি অধ্যায়। বর্তমানে মানুষের জীবনের মেয়াদকাল বেড়ে যাওয়ায় নারী জীবনের এক তৃতীয়াংশই চলে গেছে মেনোপজের দখলে। আর ঠিক এ কারণেই আমাদের এ বিষয়ে সচেতনতাটা হয়ে পড়েছে জরুরী ।

মেনোপজ কেন হয়, তা আমরা কম-বেশী সবাই জানি। এ সময় মূল যেটি ঘটে তা হল, শরীরে ইস্ট্রোজেনের পরিমাণ কমে যাওয়া। আর এতেই ঘটতে থাকে যত ধরনের বিপত্তি । এর মধ্যে সবচেয়ে অধিক যে বিপত্তিটি আমাদের মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় সেটি হল, হাড়ের ক্ষয়।

সাধারণভাবে,হাড়ের ঘনত্বের কথা যদি বলি তাহলে নারী তার বিশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে এ দিক থেকে সবচেয়ে ভাল অবস্থানে থাকে। এরপর আস্তে আস্তে এটা কমতে থাকে পঁয়ত্রিশের দিক থেকে।

আমরা প্রথমেই জেনে নিই, হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে কিসে? অনেক অনেক কারণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারন হল বয়স বেড়ে যাওয়া, পারিবারিক ইতিহাস, ভিটামিন ডি ঘাটতি, ক্যালসিয়ামের ঘাটতি, ধূমপান, এলকোহল গ্রহন, কম ওজন, জীবনযাত্রার স্টাইল ইত্যাদি।

এখন আসি আসল কথায়। মেনোপজের সাথে হাড় ক্ষয়ের কি সম্পর্ক? সাধারণভাবে হাড়ের ক্ষয় রোধে ইস্ট্রোজেনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মেনোপজে যেহেতু ইস্ট্রোজেন কমে যায় মাত্রাতিরিক্তভাবে, সুতরাং বেড়ে যায় হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি। একদিকে নতুন হাড়ের টিস্যু তৈরী হওয়া বন্ধ হয়ে যায়, অন্যদিকে পুরনো হাড়ের টিস্যুর স্থাপত্যশৈলীর অবনতি ঘটতে থাকে। সামগ্রিক হাড়ের পুরুত্ব কমতে থাকে যার ফলস্রুতিতে হাড় হয়ে উঠে ভঙ্গুর। সুতরাং, বুঝতেই পারছেন বেড়ে যায় হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি।

মেনোপজে সবচেয়ে বেশী ভাঙার ঝুঁকিতে থাকে কব্জি, হিপ এবং স্পাইনের হাড়। আমরা কিন্তু আমাদের আশেপাশে বয়স্ক মহিলাদের অনেককেই কুঁজো হয়ে লাঠির উপরে ভর করে হাঁটতে দেখি। এর মূল কারণই হল পিঠের স্পাইনের হাড় ক্ষয়।
ভয় পেয়ে গেলেন? না, ভয়ের কিছু নেই। যদি আমরা সময়মত সচেতন হই তাহলে অনেকাংশে এই ভয়কে জয় করতে পারব সহজেই। আসুন, জেনে নিই কিছু ছোট ছোট টিপস।

১)আমরা বেশীরভাগ মেয়েই সারাজীবন নিজের শরীরটাকে উপেক্ষা করি হেলায় ফেলায়। ভেবে রাখি, বয়স হোক তখন না হয় যত্ন নেব। না, এটা আমাদের ভুল ধারনা। এই যে আমি আপনি আমরা সারাজীবন নিজের শরীরে একটু একটু করে ঘাটতি তৈরী করছি, এটাই একদিন বড় আকার ধারণ করে হাড় ক্ষয়ের মত ভয়ানক সমস্যা উপহার নিয়ে আসবে আমাদের জীবনে।পিরিয়ডের সময়, সন্তান ধারণ, সন্তান প্রসব, সন্তানের লালন-পালন দুগ্ধপানের সময় আমাদের শরীর থেকে ক্যালসিয়াম বা অন্যান্য মিনারেল চলে যাচ্ছে, আমরা সেটা কখনোই আমলে নেই না। ফলে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করতে হাড়ের ঘনত্ব। সুতরাং, সময়মত নিজের শরীরের ঘাটতি পূরণ করুন।
-পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন। ক্রাইসিসের সময়গুলোতে যেমন, গর্ভধারণ কিংবা ব্রেস্ট ফিডিংয়ের সময়গুলোতে সমৃদ্ধ খাবারের পাশাপাশি ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা জরুরী।
-হাড়ের জন্য ভিটামিন ডি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন কিছু সময়ের জন্য সানবাথ করুন। সকাল বিকেলের হালকা রোদ নয়, বরং কিছুটা কড়া রোদে দিনের অল্প কিছু সময় ব্যয় করুন। এতে আপনার শরীরের চামড়াই পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি উৎপন্ন করবে। সাথে ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খেতে পারেন।
- ভিটামিন কে সমৃদ্ধ খাবার খান।

২) হজম প্রক্রিয়া সচল রাখার জন্য সময় থাকতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। তা না হলে আপনি যত সমৃদ্ধ খাবারই খান না কেন, হজমের অভাবে তা কিছুই আপনার শরীরের কাজে আসবে না।

৩) জীবনযাপন পদ্ধতি বা লাইফস্টাইলে পরিবর্তন আনুন। নিয়মিত হাঁটা,ব্যায়াম ইত্যাদির মাধ্যমে শরীরটা সচল রাখুন। এতে হাড় মজবুত হবে। বাড়বে হাড়ের ঘনত্ব।

৪) স্ট্রেস বা উদ্বিগ্নতা পরিহার করুন। মনে রাখবেন, স্ট্রেস আপনার হজমে সমস্যা সৃষ্টি করবে। কর্টিসল নামক এক ধরনের হরমোন নি:শরণ করবে যা আপনার গ্রহণ করা ক্যালসিয়াম হজমে বাঁধা সৃষ্টি করবে।

৫) কিছু জিনিস আপনার খাদ্যতালিকা থেকে পরিহার করুন যেগুলো কোন না কোনভাবে আপনার রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। যেমন, ক্যাফেইন, সিগারেট, এলকোহল, অধিক লবনযুক্ত খাদ্য ইত্যাদি।

৬) অনেকেই কিছু ওষুধ লম্বা সময় ধরে গ্রহন করেন যেগুলো পক্ষান্তরে হাড় ক্ষয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে স্টেরডেয়ের কথা। সুতরাং, দীর্ঘ সময় ধরে কোন ওষুধ গ্রহণ করলে সেটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবশ্যই জেনে নিন আপনার ডাক্তারের কাছে।

অবশিষ্ট কিছু কথা। মেনোপজ নারীর জীবনের শেষ অধ্যায় হলেও শুরু থেকেই এ সম্পর্কে জানুন, সচেতন হোন, সতর্ক হোন। তাহলেই দেখবেন খুব স্বাভাবিকভাবেই এর জটিলতাগুলো এড়িয়ে উপভোগ করতে পারছেন আপনার জীবনের শেষ অধ্যায়টুকু।মেনোপজ আসার আগেই হাড়ের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে যত্নবান হোন। লাঠির উপরে ভর করে নয়, জীবনের শেষ দিনগুলো নিজের উপরে ভর করে চলুন।

শুরু থেকে শেষ অবধি জীবনের একেকটা অধ্যায় একেক রকম সুন্দর। সচেতন হোন, উপভোগ করুন নারী জীবনের প্রতিটি অধ্যায়।

ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

ডা.ফাহমিদা শিরীন নীলা
এমবিবিএস; বিসিএস(স্বাস্হ্য),এফসিপিএস(গাইনী এন্ড অবস্)
ফিগো ফেলো(ইটালী)
গাইনী কনসালটেন্ট,
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বগুড়া।
কালচারাল সেক্রেটারি,ওজিএসবি, বগুড়া

এই পাতাটি ২০বার পড়া হয়েছে

স্বাস্থ্য প্রবন্ধ