ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণ কী? যেসব উপসর্গ অবহেলা করা বিপজ্জনক
Share on

ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণ কী? যেসব উপসর্গ অবহেলা করা বিপজ্জনক

বর্তমানে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস খুবই সাধারণ একটি রোগে পরিণত হয়েছে। শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই এখন এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আগে মনে করা হতো শুধু বয়স্ক মানুষই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন, কিন্তু এখন তরুণ এমনকি শিশুদের মধ্যেও এই রোগ দেখা যাচ্ছে। সমস্যার বিষয় হলো, অনেক মানুষ দীর্ঘদিন বুঝতেই পারেন না যে তাদের শরীরে ডায়াবেটিস বাসা বেঁধেছে। কারণ শুরুতে এর লক্ষণগুলো অনেক সময় খুব সাধারণ মনে হয়।

ডায়াবেটিস মূলত এমন একটি অবস্থা, যখন শরীরে রক্তের শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। শরীর ঠিকভাবে ইনসুলিন তৈরি করতে না পারলে বা ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ না করলে এই সমস্যা হয়। সময়মতো শনাক্ত না হলে এটি হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা, চোখের ক্ষতি কিংবা স্নায়ুর জটিলতার মতো বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো জানা খুব জরুরি।

বারবার প্রস্রাব হওয়া

ডায়াবেটিসের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলোর একটি হলো ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া। বিশেষ করে রাতে বারবার ঘুম থেকে উঠে টয়লেটে যেতে হতে পারে। রক্তে অতিরিক্ত চিনি জমে গেলে কিডনি সেই অতিরিক্ত গ্লুকোজ শরীর থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ কারণে প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যায়।

অনেকেই গরমের সময় বেশি পানি খাওয়ার কারণে এমন হচ্ছে বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এমন সমস্যা চলতে থাকলে অবশ্যই সতর্ক হওয়া দরকার।

অতিরিক্ত পিপাসা লাগা

বারবার প্রস্রাবের কারণে শরীর থেকে অনেক পানি বের হয়ে যায়। ফলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয় এবং তৃষ্ণা বেড়ে যায়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি পানি পান করেও তৃষ্ণা মেটাতে পারেন না।

যদি দেখা যায়, সবসময় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে বা বারবার পানি খেতে ইচ্ছা করছে, তাহলে এটিকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।

অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগা

ডায়াবেটিসে শরীর খাবার থেকে ঠিকভাবে শক্তি নিতে পারে না। ফলে শরীর বারবার খাবারের চাহিদা জানায়। এজন্য আক্রান্ত ব্যক্তি অস্বাভাবিকভাবে বেশি ক্ষুধা অনুভব করতে পারেন।

অনেক সময় মানুষ মনে করেন, বেশি কাজ করার কারণে ক্ষুধা বেড়েছে। কিন্তু যদি নিয়মিত খাওয়ার পরও দ্রুত ক্ষুধা লাগে, তাহলে এটি ডায়াবেটিসের লক্ষণ হতে পারে।

হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া

অনেকের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের শুরুতে ওজন কমে যেতে পারে। শরীর যখন গ্লুকোজ থেকে শক্তি নিতে পারে না, তখন চর্বি ও মাংসপেশি ভেঙে শক্তি তৈরি করতে শুরু করে। এর ফলে দ্রুত ওজন কমে যায়।

বিশেষ করে কোনো ডায়েট বা ব্যায়াম ছাড়াই যদি ওজন কমতে থাকে, তাহলে অবশ্যই রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা দরকার।

সবসময় ক্লান্ত লাগা

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেক মানুষই সারাক্ষণ দুর্বল বা ক্লান্ত অনুভব করেন। কারণ শরীর ঠিকভাবে গ্লুকোজ ব্যবহার করতে পারে না, ফলে পর্যাপ্ত শক্তি তৈরি হয় না।

অনেকেই এটিকে কাজের চাপ, ঘুম কম হওয়া বা মানসিক চাপের কারণে হচ্ছে মনে করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক ক্লান্তি থাকলে সেটি ডায়াবেটিসের ইঙ্গিত হতে পারে।

চোখে ঝাপসা দেখা

রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে চোখের লেন্সে প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ঝাপসা দেখা বা চোখে অস্পষ্টতা তৈরি হতে পারে। অনেকেই প্রথমে মনে করেন চোখের পাওয়ার বেড়েছে। কিন্তু হঠাৎ দৃষ্টিতে পরিবর্তন এলে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করানো জরুরি।

দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকলে চোখের মারাত্মক ক্ষতিও হতে পারে।

ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া

শরীরে কোনো কাটা বা ঘা হলে সেটি স্বাভাবিকের তুলনায় দেরিতে শুকালে সতর্ক হওয়া দরকার। ডায়াবেটিস রক্ত সঞ্চালন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে, যার কারণে ক্ষত দ্রুত ভালো হতে চায় না।

বাংলাদেশে অনেক মানুষ পায়ের ছোট ক্ষত বা ফোস্কা অবহেলা করেন। কিন্তু ডায়াবেটিস থাকলে ছোট ক্ষতও বড় জটিলতার কারণ হতে পারে।

হাত-পা ঝিনঝিন করা

রক্তে অতিরিক্ত শর্করা দীর্ঘদিন থাকলে স্নায়ুর ক্ষতি হতে পারে। এর ফলে হাত-পা অবশ লাগা, ঝিনঝিন করা বা জ্বালাপোড়ার মতো অনুভূতি হতে পারে।

অনেক সময় মানুষ এটিকে সাধারণ দুর্বলতা ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু বারবার এমন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।

ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা

ডায়াবেটিসে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, চুলকানি বা বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ঘাম হয় এমন জায়গায় ফাঙ্গাল ইনফেকশন বেশি হতে পারে।

নারীদের ক্ষেত্রে বারবার ইস্ট ইনফেকশনও ডায়াবেটিসের একটি লক্ষণ হতে পারে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

কিছু মানুষের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। যেমন—

বাংলাদেশে বর্তমানে অনিয়মিত জীবনযাপন, কম হাঁটা এবং ফাস্টফুড নির্ভর খাদ্যাভ্যাসের কারণে ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

কখন পরীক্ষা করানো জরুরি?

উপরের কয়েকটি লক্ষণ একসাথে দেখা দিলে দেরি না করে রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা উচিত। সাধারণ রক্ত পরীক্ষা করলেই অনেক সময় ডায়াবেটিস ধরা পড়ে যায়। দ্রুত শনাক্ত করা গেলে জীবনযাত্রা পরিবর্তন, নিয়মিত ব্যায়াম ও চিকিৎসার মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

অনেক মানুষ ভয় বা অবহেলার কারণে পরীক্ষা করাতে চান না। কিন্তু যত দেরি হবে, জটিলতার ঝুঁকিও তত বাড়বে।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কী করবেন?

ডায়াবেটিস পুরোপুরি প্রতিরোধ সবসময় সম্ভব না হলেও ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। এজন্য কিছু অভ্যাস খুব গুরুত্বপূর্ণ—

শেষ কথা

ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা শুরুতে নীরবে শরীরের ক্ষতি করতে পারে। তাই শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বারবার প্রস্রাব, অতিরিক্ত পিপাসা, ক্লান্তি বা ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোকে অবহেলা না করে সময়মতো পরীক্ষা করানো উচিত।

সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই পারে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ও জটিলতা কমাতে। নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের প্রতিও খেয়াল রাখুন। কারণ সময়মতো ধরা পড়লে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব।

 

👁 ৩২

স্বাস্থ্য প্রবন্ধ