পরিবারে বাবা-মা, ভাই বা বোনের ডায়াবেটিস থাকলে অনেকেই চিন্তায় পড়ে যান—“আমারও কি ডায়াবেটিস হবে?” বাস্তবতা হলো, টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে বংশগত প্রভাব সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটাও সমানভাবে সত্য যে শুধু জিনই সবকিছু নির্ধারণ করে না। জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং শারীরিক পরিশ্রমের মতো বিষয়গুলোও বড় ভূমিকা রাখে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা বা মায়ের একজনের টাইপ-২ ডায়াবেটিস থাকলে সন্তানের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। আর যদি বাবা-মা দুজনেরই ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে সেই ঝুঁকি ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। একইভাবে আপন ভাই বা বোনের ডায়াবেটিস থাকলেও ঝুঁকি অনেকটা বেড়ে যায়। তবে এই ঝুঁকি মানেই যে রোগটি হবেই—এমন নয়।
আসলে আমাদের শরীরের জিনের মধ্যে কিছু রোগের প্রবণতা বা সম্ভাবনা বহন করা থাকে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ কিংবা কিছু ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা যায়। কিন্তু জিন একা কাজ করে না। জিনের সঙ্গে প্রতিদিনের জীবনযাত্রার একটি সম্পর্ক বা “মিথস্ক্রিয়া” থাকে। অর্থাৎ, আপনি কী খান, কতটা হাঁটাচলা করেন, ওজন কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখেন, ঘুম কেমন হয়—এসব বিষয়ও ঠিক করে দেয় ভবিষ্যতে রোগটি প্রকাশ পাবে কি না।
চিকিৎসকদের ভাষায়, টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে “লাইফস্টাইল” বা জীবনযাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে অনেক সময় বংশগত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন এড়ানো সম্ভব হয়। আবার কারও ক্ষেত্রে রোগ হওয়ার বয়সও অনেক পিছিয়ে যেতে পারে।
এর একটি বাস্তব উদাহরণ হতে পারে এমন একজন ব্যক্তি, যার বাবার ৫২ বছর বয়সে ডায়াবেটিস ধরা পড়েছিল। পরিবারে রোগের ইতিহাস থাকায় তাঁর নিজেরও একই বয়সে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু তিনি ছোটবেলা থেকেই মিষ্টি ও অতিরিক্ত ভাত কম খেতেন। নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস ছিল, প্রতিদিন প্রায় ৫–৬ কিলোমিটার হাঁটতেন। এমনকি অফিস থেকে বাসায়ও অনেক সময় হেঁটে ফিরতেন। ফলে তাঁর ওজন নিয়ন্ত্রণে ছিল, ঘুম ভালো হতো এবং মানসিক চাপও কম থাকত। এখন ৬১ বছর বয়সেও তাঁর ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ হয়নি এবং নিয়মিত কোনো ওষুধও খেতে হয় না।
বর্তমানে তাঁর খাদ্যাভ্যাসও খুবই সহজ ও পরিমিত। সকালে রুটি, সবজি, সিদ্ধ ডিম ও চা; দুপুরে অল্প ভাত, মাছ, ডাল ও সবজি; রাতে রুটি ও সবজি—এভাবেই চলেন তিনি। মাঝে মাঝে বাদাম বা বীজজাতীয় খাবার খান। অর্থাৎ, খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত তেল, চিনি বা অতিভোজন নেই। এই ধরনের পরিমিত ও নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে।
ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
• নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা করা
• ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
• অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া
• পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা
• মানসিক চাপ কমানো
• বছরে অন্তত একবার রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা, বিশেষ করে পরিবারে ইতিহাস থাকলে
সবশেষে বলা যায়, বংশগত ঝুঁকি থাকলে সচেতনতা আরও বেশি প্রয়োজন। কারণ জিন পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, কিন্তু জীবনযাপন পরিবর্তন করা সম্ভব। আর অনেক ক্ষেত্রেই সেই পরিবর্তনই ভবিষ্যতের ডায়াবেটিসকে দূরে রাখতে বড় ভূমিকা রাখে।
👁 ৫৮