আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় যখন কোন দম্পতি সন্তান জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়, সবার মনে প্রথমেই যে প্রশ্নটি আসে, মেয়েটি বা নারীটি কি তাহলে বন্ধ্যা! হোক সেটা মুখের কথায় বা আচরণে, সমাজ সেই নারী সঙ্গীকে বার বার মনে করিয়ে দিতে থাকে, “সমস্যা তোমার”।
আসলেই কি তাই? আসুন জেনে নেই চিকিৎসা বিজ্ঞান কি বলে। হতে পারে সত্যটা প্রচলিত ধারণার চেয়ে সম্পূর্ণই ভিন্ন।
সামাজিক বিশ্বাস: বন্ধ্যাত্ব মানেই “নারীর সমস্যা”
দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের অনেক অংশেই ঐতিহাসিকভাবে বন্ধ্যাত্বকে “নারীর সমস্যা” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে আসছে। বেশ কিছু সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বিষয়ের কারণে এই বিশ্বাস মানুষের মনে দৃঢ়ভাবে গেঁথে গিয়েছে:
এ কারণে, গর্ভধারণে ব্যর্থ নারীদের প্রায়শই দোষারোপ, স্বামীকে আবার বিয়ে দেওয়ার হুমকি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে বিবাহ বিচ্ছেদের সম্মুখীন হতে হয়। অথচ পুরুষদের খুব কমই কোন ডাক্তারি পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য বলা হয়।
চিকিৎসা বিজ্ঞান আসলে কি বলে?
কিন্তু গত কয়েক দশকের ক্লিনিকাল গবেষণা সামাজিক বিশ্বাসের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। বিশ্বব্যাপী প্রজনন স্বাস্থ্য তথ্য অনুসারে:
অন্য কথায় বলা যায়, বিশ্বজুড়ে বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর অবদান প্রায় সমান। পুরুষদের বন্ধ্যাত্ব কোন বিরল ঘটনা নয়, বরং সহজেই চিকিৎসা ও নিরাময় যোগ্য সাধারণ একটি সমস্যা। কিন্তু সামাজিক ট্যাবু এর কারনে এই বিষয়ে অনুসন্ধান, রোগ নির্ণয় এমনকি আলোচনা খুব কমই করা হয়।
পুরুষের সাধারণ কিছু সমস্যা যা প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়
নারীদের সাধারণ কারণ সমূহ:
সুতরাং মূল কথাটি হলো, বন্ধ্যাত্ব হলো একটি সাধারণ শারীরিক অসুস্থতা, কোন বিশেষ জেন্ডারের একার ত্রুটি বা দায়ভার নয়। অথচ চিকিৎসাগত মূল্যায়ন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীকে ঘিরেই শুরু হয় এবং প্রায়শই সেখানেই শেষ হয়।
কেন এই ভেদাভেদ?
রোগ নির্ণয়ের সুবিধা, নির্ভুলতা নয়
ঐতিহাসিক ভাবে, নারীদের জন্য ফার্টিলিটির পরীক্ষা করানো সহজতর ও সামাজিকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য, কারন নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য পরীক্ষার (যেমন- প্রসবপূর্ব যত্ন, স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত পরিদর্শনের সময়) একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে, পুরুষের ফার্টিলিটি পরীক্ষায় একজন পুরুষকে বীর্য বিশ্লেষণ (Semen analysis) করতে রাজি হলেও এ কারণে তাকে সামাজিক কলঙ্কের সম্মুখীন হতে হয়।
ভয় ও অহংবোধ
অনেক পুরুষ এসব পরীক্ষা নিরীক্ষা ইচ্ছাকৃত ভাবে এড়িয়ে চলেন, কারন তারা ভয় পান যদি তাদের কোন সমস্যা ধরা পড়ে তবে তিনি সামাজিকভাবে সকলের কাছে হেয় প্রতিপন্ন হবেন। এই ভয় ও অহংবোধের কারনে অনেক পুরুষই পরীক্ষা নিরীক্ষা এড়িয়ে চলেন, ফলে বারবার এবং প্রায়শই অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসাগত ও সামাজিক দোষারোপের বোঝা নারীটিকেই বহন করতে হয়।
পারিবারিক ও সামাজিক চাপ
সমাজে বিশেষ করে শশুরবাড়ির লোকজন এবং অন্যান্য আত্মীয় স্বজনরা গর্ভধারণের ব্যর্থতায় সাধারণত নারীকেই দায়ী করেন, তাকেই চিকিৎসা নিতে চাপ দেন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদের কথা ভাবতেও বাধ্য করেন, অথচ পুরুষ সঙ্গীটিকে এ বিষয়ে নূন্যতম কোন পরামর্শও দিতে চান না।
স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব
অনেকেই এটা জানেনই না যে বন্ধ্যাত্ব নারী ও পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক এই বেসিক শিক্ষা না থাকার কারণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই সকল ভুল ধারণা গুলো টিকে থাকে।
এই ভুল ধারণার মাশুল
বন্ধ্যাত্বকে ঘিরে সামাজিক পক্ষপাতীত্বের কারনে ক্ষতি:
এ ক্ষেত্রে নারীরা এমন একটি অযাচিত দোষারোপ, লজ্জা এবং কখনো কখনো নির্যাতনের শিকার হন যেটিতে হয়তো তাদের কোন ভূমিকাই নেই।
অপ্রয়োজনে বিয়ে ভেঙে যায়, যখন আসল কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিরাময় যোগ্য, হয়তো স্বামীর মধ্যেই সেটা থাকে।
যেহেতু পুরুষেরা জড়তা ও লোক লজ্জায় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চান না, তাই সমস্যাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে থাকে।
ভুল ধারণার বশবর্তী হওয়ার কারণে সঠিক সমস্যা নির্ণয়ে বছরের পর বছর লেগে যায়। ফলে উভয়পক্ষেরই দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, বিশেষত নারীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব তুলনামূলক ভাবে বেশি। কারন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব সামাজিক ও মানসিক চাপ তাকে একাই বহন করতে হয়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর সমাধান কি?
যখন কোন দম্পতি সন্তান লাভের ব্যর্থ হবেন, তখন ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা উভয় সঙ্গীকেই প্রয়োজনীয় ফার্টিলিটি টেস্ট করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। একটি সম্পূর্ণ ফার্টিলিটি টেস্টের মধ্যে সাধারণত অন্তর্ভুক্ত থাকে:
এভাবে যদি শুধুমাত্র নারীটিকে নয়, উভয় সঙ্গীকে একযোগে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয় তাহলে ফলাফল নির্ভুলভাবে ও দ্রুত পাওয়া যায়। তাহলে অপ্রয়োজনীয় দোষারোপ ও চিকিৎসার বোঝা চাপানোর প্রয়োজন পড়ে না।
প্রচলিত ধারণার পরিবর্তন
এই চক্র ভাঙতে বহুমুখী চেষ্টার প্রয়োজন:
জনস্বাস্থ্য শিক্ষায় স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া উচিত যে বন্ধ্যাত্ব নারী ও পুরুষ উভয়েরই হতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের উচিত, প্রথম থেকেই উভয় সঙ্গীর ব্যাপারেই প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া ও পরীক্ষা নিরীক্ষা সহ প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ উভয়কেই নিতে বলা।
পরিবার ও সমাজকে এই ধারণা ত্যাগ করতে হবে যে সন্তানহীনতা মানেই নারীর ব্যর্থতা। পুরুষদেরকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে উৎসাহিত করা উচিত, তাদের লজ্জা দিয়ে শেষ পর্যন্ত আসলে তাদেরই ক্ষতি করা হয়। এটাকে আর দশটা সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যার মতোই নেওয়া উচিত।
উপসংহার
বন্ধ্যাত্ব কেবল মাত্র “নারীর সমস্যা” নয়, এমনকি কখনো ছিলোও না। দশকের পর দশক ধরে বিশ্বব্যাপী চলা গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, এটি একটি সাধারণ শারীরিক অসুস্থতা যা নারী পুরুষ যে কারোরই হতে পারে। সামাজিক দোষারোপের এই ধারাবাহিকতা যতটা না জীববিজ্ঞান সংক্রান্ত, বরং তার চেয়েও বেশি সেকেলে সাংস্কৃতিক মনোভাব। সচেতনতা বৃদ্ধি করে ও সামাজিক কলঙ্ক দূরে ঠেলে, দম্পতিদের উচিত হবে এই সমস্যাটিকে যৌথ ভাবে মোকাবেলা করা। এটি অনুমান ভিত্তিক কোন সমাধান নয়, বরং চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষ্য।
“এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে রচিত এবং এটি পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।”
এই পাতাটি ৭বার পড়া হয়েছে