একজন নারীর জীবনে ঋতুস্রাব থেকে শুরু করে গর্ভাবস্থা, সন্তান প্রসব, এ সবকিছুতেই জরায়ু মুখ্য ভূমিকা পালন করে। অনেক কিশোরী ও তরুণী জরায়ুর এমন কিছু সমস্যা নিয়ে বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে যা আসলে ততদিন পর্যন্ত ধরা পড়ে না যতদিন না তারা মা হবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জরায়ু সংক্রান্ত সমস্যা, কারন, সেগুলো গর্ভধারণে কিভাবে বাধার সৃষ্টি করতে পারে আর এর প্রতিকারই বা কি এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানা জরুরী।
জরায়ুর সমস্যা বলতে কি বোঝায়?
জরায়ুর সমস্যা বলতে জরায়ুকে প্রভাবিত করে এমন যেকোনো গঠনগত, কার্যগত বা রোগজনিত অবস্থাকে বোঝায়। এগুলো মাসিক চক্রকে ব্যাহত করতে পারে, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার সৃষ্টি করতে পারে, ভ্রূণের ইমপ্ল্যানটেশন বা প্রতিস্থাপনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, অথবা গর্ভাবস্থাকে পূর্ণকাল পর্যন্ত বহন করা কঠিন বা অসম্ভব করে তুলতে পারে। কিছু সমস্যা জন্মগত, অর্থাৎ একটি মেয়ে এগুলো নিয়েই জন্মায়। আবার অন্যগুলো হরমোনজনিত, পরিবেশগত বা সংক্রামক কারণের প্রভাবে সময়ের সাথে সাথে বিকশিত হয়।
মেয়েদের জরায়ুর সমস্যার সাধারন কারনসমূহঃ
জন্মগত অস্বাভাবিক জরায়ু
কিছু মেয়ে এমন জরায়ু নিয়ে জন্মগ্রহণ করে যা গর্ভে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়নি। ভ্রূণের বিকাশের সময় এই কাঠামোগত ত্রুটিগুলো দেখা দেয়, যখন মুলারিয়ান নালীগুলো, যে ভ্রূণীয় কাঠামোগুলো জরায়ু, ফ্যালোপিয়ান টিউব এবং যোনির উপরের অংশ গঠন করে তা একত্রিত হতে বা সঠিকভাবে বিকশিত হতে ব্যর্থ হয়।
সাধারণভাবে যেসব অস্বাভাবিকতা দেখা যায়
জরায়ুর সমস্যা বিভিন্নভাবে প্রজনন ক্ষমতায় বাধা সৃষ্টি করেঃ
দ্বিশৃঙ্গ জরায়ু - এটি হৃৎপিণ্ড-আকৃতির একটি জরায়ু যার দুটি প্রকোষ্ঠ থাকে, যা গর্ভপাত এবং অকাল প্রসবের ঝুঁকি বাড়ায়।
সেপ্টেড ইউটেরাস - একটি তন্তুময় বা পেশীময় প্রাচীর জরায়ুর গহ্বরকে বিভক্ত করে, এটি সবচেয়ে সাধারণ অস্বাভাবিকতা এবং বারবার গর্ভপাতের একটি প্রধান কারণ।
ইউনিকরনুয়েট ইউটেরাস - এক্ষেত্রে জরায়ুর কেবল এক পাশ বিকশিত হয়, ফলে শিশুর বেড়ে ওঠার জায়গা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
জরায়ু অনুপস্থিতি - এক্ষেত্রে জরায়ু সম্পূর্ণ অনুপস্থিত বা অপরিণত থাকে, যার ফলে স্বাভাবিক গর্ভধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এই অস্বাভাবিকতাগুলো প্রায়শই তখনই ধরা পড়ে, যখন কোনো নারী গর্ভধারণের চেষ্টা শুরু করেন অথবা তাঁর বারবার গর্ভপাত হয়।
এন্ডোমেট্রিওসিস
জরায়ুর আস্তরণের মতো টিস্যু যখন জরায়ুর বাইরে যেমন - ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব বা অন্যান্য শ্রোণী অঙ্গে বৃদ্ধি পায়, তখন তাকে এন্ডোমেট্রিওসিস (Endometriosis)বলা হয়। এটি প্রথম মাসিক শুরু হওয়ার সময় থেকেই হতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে নারীদের বন্ধ্যাত্বের একটি প্রধান কারণ।
এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র মাসিক ক্র্যাম্প, শ্রোণী অঞ্চলের ব্যথা এবং অতিরিক্ত রক্তপাত, যদিও কিছু মেয়ের ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। সময়ের সাথে সাথে, স্থানচ্যুত টিস্যুর কারণে সৃষ্ট প্রদাহ থেকে স্কার টিস্যু (Adhesions) তৈরি হতে পারে, যা প্রজনন অঙ্গগুলোকে বিকৃত করে এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব বন্ধ করে দেয়, ফলে ডিম্বাণু জরায়ুতে পৌঁছাতে পারে না।
এন্ডোমেট্রিওসিসের সঠিক কারণ পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে মনে করা হয় যে জিনগত কারণ, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং রেট্রোগ্রেড মেনস্ট্রুয়েশন (Retrograde menstruation) (যখন মাসিকের রক্ত পিছনের দিকে শ্রোণীচক্রে প্রবাহিত হয়) এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
জরায়ু ফাইব্রয়েড
ফাইব্রয়েড হলো মাংসপেশী এবং তন্তুময় কলার (Non-Cancerous) এমন বৃদ্ধি, যা জরায়ুর ভিতরে বা চারপাশে তৈরি হয়। যদিও এটি প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, ফাইব্রয়েড কিশোরীদের মধ্যেও দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে যাদের পরিবারে এই রোগের ইতিহাস রয়েছে বা যারা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত।
জরায়ুর গহ্বরের ভিতরে যে ফাইব্রয়েডগুলো তৈরি হয় (Submucosal fibroids) সেগুলো প্রজনন ক্ষমতার জন্য বিশেষভাবে সমস্যাজনক। এগুলো জরায়ুর আকৃতি বিকৃত করতে পারে, ভ্রূণ প্রতিস্থাপনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, অথবা ফ্যালোপিয়ান টিউব বন্ধ করে দিতে পারে।
শ্রোণিপ্রদাহ রোগ
PID হলো নারী প্রজনন অঙ্গের একটি সংক্রমণ, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ল্যামাইডিয়া বা গনোরিয়ার (Chlamydia or Gonorrhea) মতো যৌনবাহিত সংক্রমণের (STIs) কারণে হয়ে থাকে। কিশোরী মেয়েদের ক্ষেত্রে PID বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তাদের জরায়ুমুখ তখনও পুরোপুরি পরিপক্ক হয় না এবং ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের (Ascending infections) বিরুদ্ধে কম সুরক্ষা প্রদান করে।
সময়মত চিকিৎসা না করালে পিআইডি জরায়ু এবং ফ্যালোপিয়ান টিউবের ভিতরে ক্ষত সৃষ্টি করে। গুরুতর বা বারবার সংক্রমণের ফলে টিউব বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং স্থায়ী বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ এবং অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসার মাধ্যমে স্থায়ী ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
জরায়ুর অভ্যন্তরীণ আসন্জন
Asherman's Syndrome এ জরায়ুর গহ্বরের ভিতরে ক্ষতচিহ্নযুক্ত টিস্যু তৈরি হয়, যার ফলে এর দেয়ালগুলো একে অপরের সাথে লেগে যায়। অল্পবয়সী মহিলাদের ক্ষেত্রে, এটি সাধারণত গর্ভপাত বা অ্যাবর্শনের পরে ডাইলেশন অ্যান্ড কিউরেটেজ (D&C)-এর মতো কোনো জরায়ু সংক্রান্ত অস্ত্রোপচারের পর দেখা দেয়। এই লেগে থাকা টিস্যুগুলো জরায়ুর কার্যকরী এলাকা কমিয়ে দেয়, ফলে স্বাভাবিক মাসিক বন্ধ হয়ে যায় এবং ভ্রূণ স্থাপন কঠিন বা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
হরমোন ও ঋতুস্রাব সংক্রান্ত ব্যাধি
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) এবং থাইরয়েডের সমস্যার মতো অবস্থাগুলো হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, যা জরায়ুর আস্তরণকে প্রভাবিত করে। অনিয়মিত বা অনুপস্থিত মাসিক চক্রের অর্থ হলো এন্ডোমেট্রিয়াম সঠিকভাবে গঠিত হতে ও ঝরে পড়তে (Shed) পারে না, যা নিষিক্ত ডিম্বাণুর জন্য একটি প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে।
কিভাবে এই বিষয়গুলো গর্ভধারণে বাধা দেয়
জরায়ুর সমস্যা বিভিন্নভাবে প্রজনন ক্ষমতায় বাধা সৃষ্টি করেঃ
প্রতিস্থাপনে ব্যর্থতা- ক্ষতচিহ্ন (Scar tissue), আসঞ্জন (adhesions), ফাইব্রয়েড বা সেপটাম নিষিক্ত ভ্রূণকে জরায়ুর প্রাচীরে সংযুক্ত হতে বাধা দিতে পারে।
পুনরাবৃত্ত গর্ভপাত - সেপ্টেট বা বাইকর্নুয়েট জরায়ুর মতো গঠনগত অস্বাভাবিকতার কারণে ক্রমবর্ধমান ভ্রূণ পর্যাপ্তভাবে গর্ভ ধারণ করতে পারে না, যার ফলে বারবার গর্ভপাত ঘটে।
অবরুদ্ধ ফ্যালপিয়ান টিউব - এন্ডোমেট্রিওসিস এবং PID এই টিউবগুলোকে অবরুদ্ধ করতে পারে, যার ফলে শুক্রাণু ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছাতে পারে না।
প্রতিকূল জরায়ু পরিবেশ - সংক্রমণ এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতা জরায়ুর আস্তরণকে পরিবর্তন করে, যার ফলে সফলভাবে ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা কমে যায়।
প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং করনীয়
জরায়ুর অনেক রোগেরই চিকিৎসা করা সম্ভব, বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে। উদাহরণস্বরূপ, সেপ্টেট ইউটেরাসের অস্ত্রোপচার করে সংশোধন করলে গর্ভাবস্থার ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়। এন্ডোমেট্রিওসিস ওষুধ বা ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। PID এর ক্ষেত্রে, দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা শুরু করলে তা কার্যকর হয়।
যেসব মেয়েরা দীর্ঘস্থায়ী শ্রোণী ব্যথা , অস্বাভাবিক বা বেদনাদায়ক ঋতুস্রাব, অথবা খুব অনিয়মিত মাসিক চক্রের সম্মুখীন হন, তাদের একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞকে দিয়ে পরীক্ষা করানো উচিত। Pelvic ultrasound এবং MRI এর মতো ইমেজিং সরঞ্জামগুলি কোনো অস্ত্রোপচার ছাড়াই অনেক সমস্যা শনাক্ত করতে পারে।
সচেতনতাঃ বয়ঃসন্ধিকাল থেকে নিয়মিত স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ যৌন অভ্যাস এবং যেকোনো প্রজনন অঙ্গের সংক্রমণের দ্রুত চিকিৎসা হলো আগামী বছরগুলোতে জরায়ুর স্বাস্থ্য এবং মাতৃত্বের সম্ভাবনা সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
এই পাতাটি ৭বার পড়া হয়েছে