একজন পুরুষ মানুষের জন্য খুবই কঠিন একটি কাজ হলো, তার যদি বীর্যের গুণমান ও লিঙ্গোত্থান সংক্রান্ত কোন বিষয় কিছু প্রশ্ন থাকে সেগুলো কারো সাথে আলোচনা করা। এর মূল কারণ হলো জড়তা, লজ্জা ও সামাজিক কলঙ্কের ভয়। লক্ষ লক্ষ পুরুষ মানুষ এসব সমস্যার সাথে নিরবে লড়াই করেন, অথচ লজ্জার কারনে বছরের পর বছর কারো সাথে শেয়ার করতে বা চিকিৎসা নিতে দেরী করেন। অথচ বীর্য সংক্রান্ত সমস্যা এবং লিঙ্গোত্থান জনিত সমস্যা উভয়ই খুবই সাধারণ, সুপরিচিত, চিকিৎসা যোগ্য সমস্যা এবং এগুলোর খুবই কার্যকরী ও সহজলভ্য চিকিৎসা রয়েছে। তাই পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের আরোগ্যের পথে সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো এ সমস্যার বিষয়ে নীরবতা ভাঙা।
বীর্যের সমস্যা কি?
বীর্য গর্ভধারণের জন্য প্রয়োজনীয় শুক্রাণু বহন করে, এবং এর গুণমান, পরিমাণ, বা ঘনত্বের তারতম্য হলে তা ফার্টিলিটি ও যৌন স্বাস্থ্য উভয়কেই প্রভাবিত করে। বীর্য সম্পর্কিত সাধারণ সমস্যা গুলোর মধ্যে রয়েছে:
বীর্যের পরিমাণ কম
বীর্যপাতের সময় বীর্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যাওয়ার পেছনে ইনফেকশন, প্রজনন তন্ত্রে ব্লকেজ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, বা Retrograde ejaculation (যেখানে বীর্য লিঙ্গ দিয়ে বের না হয়ে মূত্রাশয়ে চলে যায়)।
শুক্রাণুর সংখ্যা কম বা শুক্রাণুর অনুপস্থিতি
এই সমস্যাগুলো স্বাভাবিক গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয় বা পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে হরমোনজনিত সমস্যা ও বংশগত রোগ Varicocele (অন্ডকোষের স্ফীত শিরা), ইনফেকশন, শুক্রাণু বহনকারী নালীর কোন সমস্যা।
শুক্রাণুর দুর্বল গতিশীলতা
শুক্রাণুর সংখ্যা ঠিক থাকলেও, যে শুক্রাণুগুলো কার্যকরভাবে সাঁতার কাটতে পারে না, সেগুলো ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছতে এবং নিষিক্ত করতে পারে না। এর কারণ হিসেবে বলা যায় ইনফেকশন, Oxidative stress, ধূমপান, অন্ডকোষে অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শ, বা অন্তর্নিহিত কোন জিনগত সমস্যা।
শুক্রাণুর অস্বাভাবিক আকৃতি
গঠনগত ত্রুটিপূর্ণ শুক্রাণুর পক্ষে ডিম্বাণুকে ভেদ করে নিষিক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। শুক্রাণুর অস্বাভাবিক আকৃতির জন্য দায়ী জীবন যাপন পদ্ধতি, বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শ, বংশগত রোগ ইত্যাদি।
অকাল বা বিলম্বিত বীর্যপাত
বীর্যপাত জনিত সমস্যা বীর্যপাতের সময় এবং নির্গমনকে প্রভাবিত করে। এই সমস্যার মূল কারণ হলো মানসিক চাপ, পার্টনারের সাথে সম্পর্কে অস্থিরতা বা অন্তর্নিহিত স্নায়বিক ও হরমোনজনিত সমস্যা।
ইরেক্টাইল ডিসফাংশান - ED কি?
Erectile dysfunction বলতে সন্তোষজনক যৌনক্রিয়ার জন্য যথেষ্ট দৃঢ় লিঙ্গোত্থান অর্জন বা তা ধারাবাহিক ভাবে বজায় রাখতে অক্ষমতাকে বোঝায়। মাঝে মাঝে অসুবিধা হওয়া স্বাভাবিক এবং সেটা কোন চিন্তার বিষয় না। কিন্তু সমস্যাটা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে বুঝতে হবে হয়তো কোন এটা সমস্যার কারনে এমনটি হচ্ছে, তাই অতিসত্বর আমলে নেওয়া উচিত।
ED - র সাধারণ শারীরিক কারণ সমূহ:
হৃদরোগ: যেহেতু লিঙ্গোত্থান সুস্থ রক্তপ্রবাহের উপর নির্ভরশীল, তাই Atherosclerosis (ধমনী সংকুচিত হওয়া) বা এ ধরনের সমস্যাগুলো ED সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ। প্রকৃতপক্ষে, ED কখনো কখনো হৃদরোগের একটি প্রাথমিক সতর্কীকরণ চিহ্ন।
ডায়াবেটিস: রক্তে শর্করার উচ্চ মাত্রা সময়ের সাথে সাথে রক্তনালী এবং স্নায়ুর ক্ষতি করে, যা ED এর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়িয়ে দেয়।
উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টরল: নারী পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টরল তাদের প্রজনন তন্ত্রে স্বাভাবিক রক্ত চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে।
স্থূলতা: স্থূলতা হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও রক্তপ্রবাহ হ্রাসের সাথে সম্পৃক্ত।
টেস্টোস্টেরনের স্বল্পতা: হরমোনের মাত্রা কমে গেলে যৌন আকাঙ্ক্ষা ও লিঙ্গোত্থান ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।
স্নায়বিক অবস্থা: Multiple sclerosis, Parkinson's রোগ বা মেরুদন্ডে আঘাতের মতো ব্যাধি লিঙ্গোত্থানের সময় প্রয়োজনীয় স্নায়ু সংকেত পাঠাতে বাধার সৃষ্টি করে।
কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ: কিছু ব্লাড প্রেসারের ওষুধ, Antidepressants এবং অন্যান্য ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ED দেখা দিতে পারে।
অস্ত্রোপচার বা আঘাত: Prostate surgery, শ্রোনী অঞ্চলে আঘাত বা ট্রমা লিঙ্গোত্থানের জন্য প্রয়োজনীয় স্নায়ু ও রক্তনালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
মনস্তাত্ত্বিক ও লাইফস্টাইলের কারণ সমূহ:
মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষন্নতা: যৌন কার্যক্ষমতার ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। শুধুমাত্র কার্যক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগেই ED এর একটি চক্র তৈরি হতে পারে।
সম্পর্কের সমস্যা: সঙ্গীর সাথে অমিমাংসিত মানসিক চাপ বা যোগাযোগের অভাব শারীরিক সমস্যা রুপে প্রকাশ পেতে পারে।
ধূমপান ও মদ্যপান: ধূমপান ও মদ্যপান উভয়ই ধীরে ধীরে রক্তনালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ও রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে।
অলস জীবন যাপন ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: স্থূলতা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় ও টেস্টোস্টেরন কমায়।
পর্ণোগ্রাফি জনিত সমস্যা: চিকিৎসকদের কাছে এটি ক্রমশই স্বীকৃত হচ্ছে যে, পর্ণোগ্রাফির অতিরিক্ত ব্যবহার কিছু পুরুষের যৌন উত্তেজনার ধরন পরিবর্তন করতে পারে।
লজ্জা কেন চিকিৎসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়:
বাংলাদেশসহ বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার অনেক সংস্কৃতিতেই যৌন স্বাস্থ্য একটি “অত্যন্ত নিষিদ্ধ বিষয়” হিসেবে রয়ে গেছে। পুরুষেরা প্রায়ই এসব সমস্যাকে “পৌরুষ হারানো” বলে ধরে নেয় এবং এসব বিষয়ে সঙ্গী, পরিবার এমনকি ডাক্তারের সাথেও শেয়ার করতে ভয় পায়, পাছে এর কারণে তাকে সমালোচিত হতে হয়। ফলস্বরূপ,
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বীর্যের সমস্যা ও ED উভয়ই উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতোই একটি শারীরিক অসুস্থতা, কোন নৈতিক ব্যর্থতা বা দূর্বলতার লক্ষণ নয়। এগুলো সাধারণ আর দশটা অসুখের মতো সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা সম্ভব।
চিকিৎসা
১. একজন Urologist বা Andrologist এর পরামর্শ নেওয়া। এই বিশেষজ্ঞরা পুরুষদের প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত এবং সঠিক ও যথাযথ পরামর্শ দিতে সক্ষম।
২. সঠিক রোগ নির্ণয় করা। বীর্য পরীক্ষা, হরমোন প্যানেল (Testosterone, FSH, LH), রক্তে শর্করার মাত্রা, হৃদরোগ ইত্যাদি বিষয়ে যথাযথ পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে শুধুমাত্র উপসর্গ নয়, এসকল কিছুর অন্তর্নিহিত কারণ সম্পর্কেও জানা যায়।
৩. মূল সমস্যার চিকিৎসা করুন। হরমোন থেরাপি, রক্ত সঞ্চালনের ওষুধ, ( যেমন- ED এর জন্য PDE5 inhibitors), varicocele এর অস্ত্রোপচার, ইনফেকশনের জন্য চিকিৎসা করার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়।
৪. মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগ দিন। কাউন্সিলিং বা থেরাপি, আপনার একার বা উভয় পার্টনারের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী হতে পারে। বিশেষত, যখন উদ্বেগ ও টানাপোড়েন পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরে প্রভাব ফেলে।
৫. লাইফস্টাইলের উন্নয়ন করুন। ধূমপান, মাদক, মদ্যপান ত্যাগ করা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মিত এসব প্র্যাকটিস করতে পারলে বীর্যের গুণমান ও লিঙ্গোত্থান সংক্রান্ত সমস্যা উভয়ই নিরাময় করা সম্ভব।
৬. যাচাই বিহীন চিকিৎসা এড়িয়ে চলুন। অনলাইনের “অলৌকিক নিরাময়”, অনিয়ন্ত্রিত ভেষজ বড়ি, বা লাইসেন্স বিহীন চিকিৎসকের কাছে থেকে নেওয়া চিকিৎসা অকার্যকর এমনকি ক্ষতিকরও হতে পারে। শুধুমাত্র লাইসেন্স প্রাপ্ত চিকিৎসকই নিরাপদ ও সঠিক চিকিৎসা প্রদান করতে পারবেন।
শেষ কথা
বীর্যের সমস্যা এবং লিঙ্গোত্থান জনিত সমস্যা বেশিরভাগ পুরুষের ধারনার চেয়েও অনেক বেশি সাধারণ এবং সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে মানুষ যা বিশ্বাস করে তার চেয়ে অনেক বেশি নিরাময় যোগ্য। এইসব সমস্যা নিয়ে নিরবতা ভেঙ্গে একজন ডাক্তার, সঙ্গী বা কোনো বিশ্বস্ত মানুষের সাথে খোলাখুলি কথা বলা কোন দূর্বলতার লক্ষণ নয়। সঠিক রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার মাধ্যমে বেশিরভাগ পুরুষই উল্লেখযোগ্য উন্নতি লাভ করেন, যা কেবল শারীরিক স্বাস্থ্যেরই নয়, আত্মবিশ্বাস ও জীবন মানও পুনরুদ্ধার করে।
“বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে রচিত, এটি কোন পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।”
এই পাতাটি ১৭বার পড়া হয়েছে