যখন কোন দম্পতি দীর্ঘ সময় ধরে বাবা মা হতে না পারেন তখন প্রথমেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় নারী সঙ্গীটিকে। অথচ বিশ্বজুড়ে বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে পুরুষের ভূমিকা প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ বন্ধ্যাত্বের জন্য নারী ও পুরুষের ভূমিকা প্রায় সমান সমান। অনেক পুরুষই জানেন না যে তাদের নিজেদের শরীর, অভ্যাস বা দৈনন্দিন জীবন যাপন সন্তান লাভের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে যেসকল বিষয় দায়ী সেগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারলে ও সময়মতো উপযুক্ত পদক্ষেপ ও চিকিৎসা নিতে পারলে অনেক সমস্যা এড়ানো সম্ভব হয়।
পুরুষদের ফার্টিলিটি বলতে কি বোঝায়?
পুরুষদের ফার্টিলিটি মূলত তিনটি মৌলিক বিষয়ের উপর নির্ভর করে: পর্যাপ্ত পরিমাণে সুস্থ শুক্রাণু তৈরি করার শারীরিক ক্ষমতা, শুক্রাণুর সঠিকভাবে চলাচল করার ক্ষমতা, এবং বীর্যপাতের সময় শুক্রাণু নির্গমনের জন্য একটি বাধাহীন পথ। শুক্রাণুর উৎপাদন, গুণমান, বা নির্গমনের যেকোনো পর্যায়ে সমস্যা দেখা দিলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।
পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের সাধারণ শারীরবৃত্তীয় কারন সমূহ:
১. Varicocele
Varicocele হলো অন্ডকোষের ভেতরের শিরা ফুলে যাওয়া, যেটা পায়ের varicose vein এর মতোই বলা যায়। পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে এটি একটি খুবই কমন, কিন্তু নিরাময় যোগ্য কারণ। এই সমস্যার কারনে অন্ডকোষের চারপাশের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, যা শুক্রাণুর উৎপাদন ব্যাহত করে এবং শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমিয়ে দেয়। Varicocele এ আক্রান্ত অনেক পুরুষদের মধ্যে কোন লক্ষণই দেখা যায় না, যতক্ষণ না যথাযথ বন্ধ্যাত্বের পরীক্ষার মাধ্যমে সেটা নির্ণয় করা হয়।
২. শুক্রাণুর সংখ্যা কম ও গুণগত মান খারাপ
Oligospermia (শুক্রাণুর সংখ্যা কম) এবং শুক্রাণুর দুর্বল গতিশীলতা ও গঠনগত (Morphological) সমস্যা পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। এই সমস্যাগুলো বংশগত বৈশিষ্ট্য, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, ইনফেকশন বা পরিবেশগত বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে আসার ফলে হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবার এর কোন কারণও খুঁজে পাওয়া যায় না, এই অবস্থাকে Idiopathic infertility বলা হয়।
৩. হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
শুক্রাণুর উৎপাদন হরমোনের এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের উপরে নির্ভর করে, বিশেষ করে টেস্টোস্টেরন, Follicle Stimulating Hormone (FSH), Luteinizing Hormone (LH), যা পিটুইটারি গ্রন্থি ও হাইপোথ্যালামাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই গ্রন্থিগুলোকে প্রভাবিত করে এমন রোগ, যেমন - পিটুইটারি টিউমার বা থাইরয়েডের সমস্যা হরমোনের মাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে এবং শুক্রাণুর উৎপাদনকে উল্লেখযোগ্য হারে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
৪. অন্ডকোষের অবস্থানগত ত্রুটি (Cryptorchidism)
কিছু কিছু ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে, জন্মের আগে একটি বা উভয় অন্ডকোষ অন্ডথলিতে নেমে আসতে ব্যর্থ হয়। শৈশবে এর প্রতিকার না করা হলে, অন্ডকোষ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যার ফলে পরবর্তীতে শুক্রাণুর উৎপাদন কমে যেতে পারে, এমনকি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেও এই অবস্থার সংশোধন নাও হতে পারে।
৫. ইনফেকশন
কিছু ইনফেকশন শুক্রাণুর উৎপাদনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে অথবা এমন ক্ষত তৈরি করতে পারে যা শুক্রাণুর চলাচলের পথ ব্লক করে দেয়। Chlamydia ও Gonorrhea র মতো যৌন বাহিত সংক্রমণ, সেইসাথে অন্ডকোষের প্রদান (Orchitis, যা প্রায়শই মাম্পসের সাথে সম্পর্কযুক্ত) বা এপিডিডাইমিসের প্রদাহ (Epididymitis) এর কমন কারণ। সময়মতো উপযুক্ত চিকিৎসা না করালে এই সকল ইনফেকশন পুরুষ প্রজনন তন্ত্রে পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে ক্ষতি করে থাকে।
৬. বীর্যপাতে সমস্যা
Retrograde ejaculation (যেখানে বীর্য লিঙ্গ দিয়ে বের না হবার পরিবর্তে মূত্রাশয়ে প্রবেশ করে) এর কারণে সহবাসের সময় শুক্রাণু নির্গমন বাধাপ্রাপ্ত হয়। ডায়াবেটিস, কোন কোন অস্ত্রোপচার (যেমন - প্রোস্টেট সার্জারি), মেরুদন্ডে আঘাত বা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদির কারণে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৭. বংশগত (Genetic) সমস্যা
Klinefelter syndrome ( এক্ষেত্রে একজন পুরুষের একটি অতিরিক্ত এক্স ক্রোমোজোম থাকে) এর মতো ক্রোমোজোমাল রোগের কারণে অন্ডকোষের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং শুক্রাণুর উৎপাদনকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে বা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়। অন্যান্য বংশগত রোগ, যেমন Cystic fibrosis সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তন পুরুষ প্রজনন তন্ত্রের কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
৮. কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা
শুক্রাণু বহনকারী নালীর যে কোনো স্থানে (যেমন - Epididymis বা Vas deferens এ) বাধার সৃষ্টি হলে শুক্রাণুর উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও তা স্খলিত হতে পারে না। ইনফেকশন, আঘাত, পূর্ববর্তী অস্ত্রোপচার (যেমন - Vasectomy), বা জন্মগত ত্রুটির কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
যেসকল কমন ভুল ও জীবন যাপন পদ্ধতির কারণে পুরুষদের ফার্টিলিটি কমে যায়
শরীরের অভ্যন্তরীণ অসুখ বিসুখ ছাড়াও শুক্রাণুর গঠনগত ত্রুটির ক্ষেত্রে দৈনন্দিন জীবন যাপন, খাদ্যাভ্যাস ও অন্যান্য বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ধূমপান ও তামাক সেবন - শুক্রাণুর সংখ্যা, গতি এবং সার্বিক গুণগত মান কমিয়ে দেয়।
অত্যাধিক মদ্যপান - সময়ের সাথে সাথে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমিয়ে দেয় ও শুক্রাণুর উৎপাদন ব্যাহত করে।
মাদক গ্রহণ - Anabolic steroids, Marijuana, এবং অন্যান্য নেশাজাতীয় মাদক সুস্থ শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোনকে দমন করতে পারে।
স্থূলতা - শরীরে অতিরিক্ত মেদ হরমোনের মাত্রা পরিবর্তন করে এবং শুক্রাণুর সংখ্যা হ্রাস করতে ভূমিকা পালন করে।
দীর্ঘক্ষণ অধিক তাপমাত্রায় থাকা - ঘন ঘন Hot tub বা Sauna ব্যবহার করা অথবা দীর্ঘক্ষণ কোলে ল্যাপটপ রেখে দিলে অন্ডকোষের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে এবং শুক্রাণুর উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
আঁটসাঁট পোশাক - আঁটসাঁট পোশাক, অন্তর্বাস বা প্যান্টও একই ভাবে অন্ডকোষের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ - দীর্ঘ মেয়াদি মানসিক চাপ হরমোন নিয়ন্ত্রণকে প্রভাবিত করে এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা ও শুক্রাণুর গুণমান হ্রাস করতে পারে।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস - অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, জিংক এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার না খেলে এর অভাবে শুক্রাণুর স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অলস জীবন যাপন - পর্যাপ্ত কায়িক পরিশ্রমের অভাব টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা হ্রাস এবং প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করতে পারে।
বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে আসা - অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে কীটনাশক, ভারী ধাতু এবং শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার সাথে শুক্রাণুর উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
Anabolic steroids এর ব্যবহার - বডিবিল্ডারদের মধ্যে এই প্রবণতা প্রচলিত। স্টেরয়েড শরীরের স্বাভাবিক টেস্টোস্টেরন উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে, যা কখনো কখনো দীর্ঘমেয়াদি বন্ধ্যাত্বের কারণ হয়।
চিকিৎসা নিতে বিলম্ব - অনেক পুরুষই সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে সাহায্য চাইতে এড়িয়ে চলেন, যার ফলে নিরাময় যোগ্য রোগও অনেক ক্ষেত্রে সময়ের সাথে সাথে আরও খারাপ হতে থাকে।
করনীয় কি?
আশার কথা হলো, পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের অনেক সমস্যাই চিকিৎসা যোগ্য বা নিরাময় যোগ্য। Varicocele প্রায়শই অস্ত্রপাচারের মাধ্যমে সংশোধন করা সম্ভব। হরমোনের ভারসাম্যহীনতার চিকিৎসা ওষুধের মাধ্যমে করা যায়। ইনফেকশন প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আগেই অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে তা নিরাময় করা যায়। এমনকি অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের সমস্যাও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় ধূমপান, মদ্যপান ত্যাগ করে, সঠিক ওজন বজায় রেখে, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে এবং অন্ডকোষ অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে আসা প্রতিরোধ করে।
পুরুষদের বন্ধ্যাত্ব নির্ণয়ের প্রথম ধাপ হলো বীর্য পরীক্ষা যার দ্বারা শুক্রাণুর সংখ্যা, গতিশীলতা, আকৃতি ও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব হয়। যেসকল পুরুষ তাদের সঙ্গীর সাথে সন্তান ধারণের জন্য এক বছর ধরে চেষ্টা করার পরও সফলকাম হতে না পারেন, তাদের অতিসত্বর একজন বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ (Urologist) এর পরামর্শ নেওয়া উচিত। যত দ্রুত সমস্যা চিহ্নিত করা যায়, তত সহজেই সমস্যার চিকিৎসা ও সমাধান করা সম্ভব হয়।
“বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে রচিত, এটি কোন পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। যেসকল পুরুষ তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত, তাদের একজন যোগ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী বা Urologist এর সাথে পরামর্শ করা উচিত। ”
এই পাতাটি ৬বার পড়া হয়েছে