বীর্য পরীক্ষা হলো বীর্য এবং শুক্রাণুর বিশ্লেষণ। এটি পুরুষের ফার্টিলিটি পরীক্ষা নামেও পরিচিত। শুক্রাণুর উৎপাদন, সংখ্যা, গঠনগত বৈশিষ্ট্য, গতি ইত্যাদি বিষয় পর্যবেক্ষণ করার জন্য সাধারণত এই পরীক্ষাটি করা হয়ে থাকে।
বীর্য হলো এক ধরনের ঘন তরল পদার্থ যা স্বামী স্ত্রীর শারীরিক মিলনের সময়ে পুরুষ প্রজনন তন্ত্র থেকে নিঃসৃত হয়। এটি নারীর জরায়ুতে প্রবেশ করে যাতে করে তা ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে পারে, ফলে একটা ভ্রূণ গঠিত হয় (গর্ভধারণের প্রথম ধাপ)।
বীর্য পরীক্ষা কেন করা হয়?
ডাক্তারেরা মূলত দুইটি কারনে বীর্য পরীক্ষা করতে বলেন।
১. বন্ধ্যাত্বের পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য
যদি কোন দম্পতি গর্ভধারণ করতে না পারে, তখন ডাক্তারেরা পুরুষ সঙ্গীটিকে বীর্য পরীক্ষা করতে বলেন।
যদিও নারী পুরুষ যে কারোরই বন্ধ্যাত্বের সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু পুরুষের বন্ধ্যাত্ব গর্ভধারণের ক্ষেত্রে ৫০% দায়ী। পুরুষের বন্ধ্যাত্বের অন্যতম প্রধান কারণ হলো শুক্রাণুর কম উৎপাদন।
২. ভ্যাসেকটমী করার পরে
Vasectomy (পুরুষের গর্ভনিরোধক প্রক্রিয়া) করার পর প্রক্রিয়াটি সফলভাবে কার্যকর হয়েছে কিনা সেটা পরীক্ষা করার জন্যও পুরুষের বীর্য পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষাটি সাধারণত Vasectomy করার ৮ থেকে ১৬ সপ্তাহ পরে করা হয়।
বীর্যের স্যাম্পল কিভাবে দেওয়া হয়?
বীর্য পরীক্ষার জন্য প্রথমত বীর্য সংগ্রহ করা হয়। সাধারণত একটি কাপে একবারের সম্পূর্ণ পরিমাণ বীর্য সংগ্রহ করতে বলা হয়। বীর্য সংগ্রহের সময়ে ডাক্তারেরা কিছু নির্দেশনা দিয়ে থাকেন, যেমন - প্রক্রিয়ার সময়ে আপনার হাত ও পুরুষাঙ্গ পরিষ্কার রাখা, কোন ধরনের লুব্রিকেন্ট ব্যবহার না করা, এক ফোটাও নষ্ট না করে পুরো বীর্য একটি কাপের মধ্যে সংগ্রহ করা। সবচেয়ে সঠিক ফলাফল পেতে হলে এসব নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা জরুরি।
স্যাম্পল সাধারণভাবে ডাক্তারের ল্যাবে গিয়ে সংগ্রহ করতে বলা হয়। তবে চাইলে বাড়ি থেকেও স্যাম্পল সংগ্রহ করা যাবে, কিন্তু সেক্ষেত্রে অবশ্যই স্যাম্পলটি রুম টেম্পারেচারে রাখতে হবে ও এক ঘণ্টার মধ্যেই ডাক্তারের কাছে জমা দিতে হবে।
বীর্য পরীক্ষা করতে যাওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি
বীর্যের স্যাম্পল দিতে যাওয়ার আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।
- ডাক্তার আপনাকে বীর্য সংগ্রহের পূর্বে ২ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত শারীরিক মেলামেশা বা হস্তমৈথুন করতে নিষেধ করবেন।
- সঠিক ফলাফল পেতে এক সপ্তাহের বেশি সময় বীর্য স্খলন থামিয়ে রাখা যাবে না। নয়তো বীর্যের শুক্রাণু কম এক্টিভ হবে।
- বীর্জ পরীক্ষার পূর্বে মদপান না করাই ভালো।
আপনি যদি কোন ধরনের ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট নিয়ে থাকেন সেটাও ডাক্তারকে জানাবেন। কারন কিছু ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট বীর্য পরীক্ষার ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে -
টেস্টোস্টেরন সাপ্লিমেন্ট - এটি কৃত্রিম উপায়ে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি করে। এটি শরীরে ভুল সংকেত পাঠায়, যার ফলে শরীরে প্রাকৃতিক ভাবে টেস্টোস্টেরন হরমোন ও শুক্রাণু উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে শুক্রাণুর সংখ্যা কম হয়ে যেতে পারে।
Anabolic steroids - বডি মাসল তৈরি করতে বডি বিল্ডারেরা এই স্টেরয়েড নিয়ে থাকেন, যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে শরীরে শুক্রাণুর উৎপাদন কমে যেতে পারে।
মারিজুয়ানা - মারিজুয়ানাতে থাকা tetrahydrocannabinol (THC) যৌন চাহিদাকে প্রভাবিত করে ও টেস্টোস্টেরন হরমোন ও শুক্রাণু উৎপাদন ব্যাহত করে।
Opiates - এটি আপনার শুক্রাণুর সংখ্যা ও টেস্টোস্টেরন হরমোন উৎপাদনকে কমিয়ে দিতে পারে।
সবচেয়ে নিখুঁত রেজাল্ট পেতে ডাক্তার হয়তো আরো একাধিকবার স্যাম্পল দিতে বলতে পারেন, প্রথমবার স্যাম্পল দেওয়ার ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে। কারন শুক্রাণুর বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন কারণে একেক সময় একেক রকম হতে পারে।
ল্যাবে বীর্যের স্যাম্পল নিয়ে মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে যেসব বিষয়ে অনুসন্ধান করা হয় -
শুক্রাণুর পরিমাণ বা সংখ্যা বা ঘনত্ব (Concentration) - এক মিলিলিটার নরমাল বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যা ১৫ মিলিয়ন হয়। পরিমাণ এর থেকে কম হলে তাকে স্বল্প সংখ্যা (Low count) হিসেবে গণ্য করা হয়।
শুক্রাণুর গতি (Motility) - ডাক্তার দেখবেন কত শতাংশ শুক্রাণু সঠিকভাবে চলাচল করে। সাধারণত ৫০% বা তার বেশি পরিমাণ শুক্রাণু চলাচলে সক্ষম হতে হবে।
শুক্রাণুর গঠনগত বৈশিষ্ট্য (Morphology) - শুক্রাণুর আকার ও আকৃতি ডিম্বাণুকে সফলভাবে নিষিক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নরমাল বীর্যে কমপক্ষে ৪% শুক্রাণুর গঠনগত বৈশিষ্ট্য ঠিকঠাক হতে হবে।
এছাড়াও আপনার শুক্রাণু পরীক্ষার সাথে সাথে ডাক্তার আপনার স্যাম্পলের আরো কিছু বিষয় পর্যবেক্ষণ করবেন -
বীর্যের ঘনত্ব - আপনি বীর্য পরীক্ষার জন্য একবারে কতটুকু বীর্য দিতে সক্ষম হচ্ছেন। নরমাল পরিমাণ হলো ১.৫ মিলিলিটার বা আধা চা চামচ। যদি পরিমাণ এর চেয়ে কম হয় তাহলে বুঝতে হবে আপনার শুক্রাশয় সংলগ্ন থলি (Seminal vesicles) ঠিকঠাক মতো কাজ করছে না অথবা ব্লক হয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে আপনার প্রোস্টেট সংক্রান্ত কোন সমস্যা রয়েছে।
বীর্যের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য - নরমাল বীর্যের pH লেভেল ৭.১ থেকে ৮.০। এর থেকে কম pH লেভেলের বীর্য মানে সেটা অম্লীয় (Acidic) এবং উচ্চ pH লেভেল অর্থ এটি ক্ষারীয় (Alkaline)। অস্বাভাবিক pH লেভেল শুক্রাণুর গতি ও গঠনগত বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
বীর্যের তরলীকরণের সময় (Liquefaction) - স্খলিত হওয়ার সময়ে বীর্য সাধারণত ঘন দ্রবণ আকারে বের হয়। বীর্যের তরলীকরণের সময় বলতে বোঝায় স্খলিত হবার ঠিক কতক্ষন পরে এটি তরল রূপ ধারণ করে, যেটা ২০ মিনিট হওয়া স্বাভাবিক। যদি ২০ মিনিট পরেও বীর্য তরল রূপ ধারণ না করে বা একেবারেই তরল আকারে রূপ না নেয় তাহলে ধরে নিতে হবে এক্ষেত্রে কোন সমস্যা রয়েছে।
যদি Semen analysis এ অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়ে, ডাক্তারেরা তখন আরো কিছু বন্ধ্যাত্ব সংক্রান্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে বলতে পারেন।
অস্বাভাবিক ফলাফল বলতে কি বোঝায়?
বীর্য এনালাইসিসের অস্বাভাবিক ফলাফল আসলে ধরে নিতে হবে, হয় আপনার প্রজনন নালীতে সমস্যা রয়েছে অথবা আপনার শরীর যথেষ্ট পরিমাণে টেস্টোস্টেরন হরমোন তৈরি করছে না।
তবে এসব ফলাফলের মানেই বন্ধ্যাত্ব নয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আপনার শুক্রাণুর সংখ্যা কম কিন্তু একি সাথে আপনি যথেষ্ট ফার্টাইল হতে পারেন। অন্যদিকে, হতে পারে আপনার শুক্রাণুর সংখ্যা বেশি আছে, তবুও আপনি ইনফার্টাইল হতে পারেন। তাই কোন উপসংহারে পৌঁছানোর আগেই ডাক্তারের সাথে কথা বলে এ বিষয়ে কথা বলে সঠিক তথ্য জেনে নিন।
অনেকগুলো বিষয় আছে যা Semen analysis কে প্রভাবিত করতে পারে -
বয়স, জেন্ডার, বা যে কোন স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে বীর্য পরীক্ষার ফলাফলে ভিন্নতা দেখা দিতে পারে।
বীর্য পরীক্ষা করতে কত টাকা খরচ হতে পারে?
বাংলাদেশে প্রাইভেট হাসপাতাল, ইনফার্টিলিটি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে Semen analysis করতে আনুমানিক ৭৫০ থেকে ২৫০০ টাকা খরচ হতে পারে। সরকারি হাসপাতাল বা বিশেষায়িত রিসার্চ ইনস্টিটিউটে এই খরচ ১০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
উপসংহার
বন্ধ্যাত্ব যাচাইয়ের জন্য Semen analysis পরীক্ষার মাধ্যমে বীর্য ও শুক্রাণু টেস্ট করা হয়। এই ক্ষেত্রে প্রাপ্ত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ডাক্তার তার পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তাই এই প্রক্রিয়ার রেজাল্ট সঠিক হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
“এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে রচিত এবং এটি কোন পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।”
👁 ৯