দীর্ঘদিন ধরে গর্ভধারণের চেষ্টা করেও সফল না হলে নির্দিষ্ট সময়ের পর (৬ মাস থেকে ১ বছর) ডাক্তার সাধারণত সেসব দম্পতিদের কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে বলেন, বন্ধ্যাত্ব সংক্রান্ত পরীক্ষা। মহিলাদের ক্ষেত্রে দুইটা বিষয়ে ফোকাস করা হয়। এক, জরায়ুর গঠনগত পরীক্ষা যা গর্ভধারণ ও ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবং দুই, বিভিন্ন হরমোনজনিত সমস্যার পরীক্ষা যা মহিলাদের অভুলেশন থেকে শুরু করে বাচ্চা জন্মদান পর্যন্ত সকল শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করতে সাহায্য করে।
কেন জরায়ুর টেস্ট সবার আগে করতে বলা হয়?
গর্ভধারণের সকল প্রক্রিয়া জরায়ুকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। যদি জরায়ু ঠিক মতো কাজ করতে সক্ষম না হয়, সুস্থ ডিম্বাণু বা শুক্রাণু কোন কাজেই আসে না। এক্ষেত্রে অনেক সময়ই ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের সমস্যা দেখা দেয়, বা যদি গর্ভধারণ সম্ভবও হয় তবুও গর্ভপাতের ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই, বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞরা জরায়ু সুস্থ, স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম আছে কি না সেটাই প্রথমে যাচাই করেন।
Transvaginal Ultrasound
ডাক্তারেরা বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যেই টেস্ট দিয়ে শুরু করেন তা হলো Transvaginal Ultrasound. কারন, এটি খুব সহজেই, স্বল্প সময়ে করা যায় এবং এর মাধ্যমে অনেক তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। একটি ছোট Probe শ্রোনী অঞ্চলে প্রবেশ করিয়ে জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের ইমেজ বা ছবি পাওয়া যায়। তলপেটের আল্ট্রাসাউন্ড করে সাধারণত এতো ভালো ইমেজ ও সঠিক তথ্য পাওয়া সম্ভব হয় না। Transvaginal Ultrasound স্ক্যানে ডাক্তারেরা মূলত দেখেন যে জরায়ুর মধ্যে কোন ফাইব্রয়েড, সিস্ট আছে কি না, বা জরায়ুর endometrial লাইন কতোটুকু পুরু, জরায়ুর অন্যান্য গঠনগত বৈশিষ্ট্য ঠিকঠাক আছে কিনা। এছাড়াও ফলিকল ঠিকমতো বেড়ে উঠছে কিনা সেটাও শনাক্ত করা যায়।
Hysterosalpingography (HSG)
Hysterosalpingography নামটা শুনতে বেশ খটমটে মনে হলেও এটি একটি X-ray পরীক্ষা মাত্র, যেখানে একটি দ্রবন (Dye) cervix বা জরায়ুর মুখের ভেতর দিয়ে জরায়ুতে পরিবাহিত করা হয়। যখন এই নির্দিষ্ট দ্রবণটি জরায়ুর মধ্যে হয়ে, ফ্যালোপিয়ান টিউব দিয়ে প্রবাহিত হয়, X-ray তে এর গতিপথ সঠিকভাবে ফুটে ওঠে। এই পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে মূলত দুইটা জটিল প্রশ্নের উত্তর মেলে। এক, জরায়ু অঞ্চলের গঠনগত দিক দিয়ে ঠিকঠাক আছে কিনা আর দুই, ফ্যালোপিয়ান টিউব খোলা আছে কিনা? ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লক থাকা মহিলাদের বন্ধ্যাত্বের অন্যতম প্রধান কারণ, এবং এটি চিকিৎসা যোগ্য। তাই বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় Hysterosalpingography টেস্টের গুরুত্ব সীমাহীন।
Hysteroscopy
যদি আল্ট্রাসাউন্ড বা HSG দ্বারা জরায়ুর অভ্যন্তরে কোন পলিপ, ফাইব্রয়েড, কোন ক্ষত চিহ্ন বা অন্য কোন সমস্যা ধরা পড়ে, তখন ডাক্তারেরা সাধারণত Hysteroscopy করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। একটি ক্ষুদ্র ক্যামেরা জরায়ুর মধ্যে প্রবেশ করানো হয়, যাতে ডাক্তার জরায়ুর অভ্যন্তরের সমস্যাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র কোন কাটাছেঁড়ার ক্ষত, ছোট সাইজের পলিপ এমন ধরনের ছোটখাটো কোন সমস্যা থাকলে সেটাও এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঠিক করতে পারেন।
Saline Infusion Sonography (SIS)
এটি সাধারণ আল্ট্রাসাউন্ড এর মতোই, এক্ষেত্রে শুধুমাত্র স্ক্যান করার পূর্বে পরিশোধিত স্যালাইন জরায়ুর মধ্যে প্রবেশ করানো হয় যাতে করে জরায়ুর অভ্যন্তরভাগ কিছুটা প্রসারিত হয়। এর ফলে জরায়ুর অভ্যন্তরভাগ আরো বেশি স্পষ্ট ভাবে দেখা যায়। পূর্বের টেস্ট গুলোতে যেসব পলিপ, ফাইব্রয়েড, সিস্ট বা কোন ক্ষতচিহ্ন যদি দেখা নাও যায়, এই টেস্টের মাধ্যমে সেগুলো শনাক্ত করা সহজ হয়ে যায়। অনেক ক্লিনিকেই টেস্টটি একটা সাধারণ আল্ট্রাসাউন্ড ও Hysteroscopy এর মধ্যবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
MRI (কিছু কিছু ক্ষেত্র বিশেষে)
বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবসময় MRI করার প্রয়োজন হয় না, যদি না জরায়ুর অভ্যন্তরে কোন অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়। যেমন - সেপ্টেট বা দ্বিশৃঙ্গ (Bicornuate) জরায়ু। সেক্ষেত্রে কোন ধরনের অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জরায়ুর অভ্যন্তরভাগের সার্বিক চিত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ও সুনির্দিষ্ট ভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য MRI করা হয়।
বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় হরমোনের গুরুত্ব কতটুকু?
একটা সুস্থ সবল ও কর্মক্ষম জরায়ু থাকার পরেও গর্ভধারণ সম্ভব হবে না, যদি না সময়মতো অভুলেশন না হয় অথবা যথাযথ হরমোনাল সিগন্যাল না পেলে গর্ভাবস্থাও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় জরায়ুর টেস্টের পাশাপাশি হরমোনের মাত্রা টেস্ট করাও অত্যন্ত জরুরি।
Follicle Stimulating Hormone (FSH) and Luteinizing Hormone (LH)
এই টেস্ট দুইটি সাধারনত মাসিক চক্রের দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে করা হয়। FSH এর মাধ্যমে দেখা হয় ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা কতটুকু। FSH ও LH হরমোনের মাত্রার পার্থক্য থেকে PCOS এর মতো সমস্যা নির্ণয় করা যায়। উচ্চ মাত্রার FSH হরমোনের অর্থ হলো গর্ভাশয় স্বাভাবিক অবস্থায় যেভাবে কাজ করার কথা তেমনটা করছে না।
Anti-Müllerian Hormone (AMH)
AMH পরীক্ষার মাধ্যমে ঠিক কি পরিমান ovarian reserve অবশিষ্ট রয়েছে তা শনাক্ত করা যায়। এই টেস্ট করা অন্যান্য হরমোনাল টেস্টের চেয়ে তুলনামূলক সহজ, কেননা এটি মাসিক চক্রের যে কোন দিনই করা যায়। AMH হরমোনের মাত্রা কমে গেলে বোঝা যায় ডিম্বাণুর পরিমাণ কম। ফলে গর্ভধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সময় খুব কম পাওয়া যায় ও বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসার পদ্ধতি বদলে ফেলতে হয়।
Estradiol
এটি সাধারণত FSH টেস্টের সাথেই করা হয়। Estradiol হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করে দেখা হয় যে, ডিম্বাশয়ের রিজার্ভের (Ovarian reserve) পরিমাণ সঠিকভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না।
Progesterone
Progesterone হরমোন সাধারণত অভুলেশনের প্রায় এক সপ্তাহ পরে করা হয়, মাসিকের আনুমানিক ২১ থেকে ২৮ তম দিনে। চিকিৎসকেরা এর দ্বারা নিশ্চিত হতে পারবেন যে অভুলেশন হয়েছে কিনা অথবা যদি কোন ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়ে থাকে সেটাকে সঠিকভাবে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন শরীর থেকে উৎপাদিত হচ্ছে কিনা।
Thyroid-Stimulating Hormone (TSH) and Prolactin
থায়রয়েড জনিত সমস্যার কারণে ও Prolactin হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলে সেগুলো অভুলেশনকে প্রভাবিত করতে পারে। অনেক সময় Unexplained infertility এর ক্ষেত্রে এই টেস্টের মাধ্যমে সঠিক সমস্যা নির্ণয় করা সম্ভব হয়।
উপসংহার
উপরে উল্লেখিত পরীক্ষা নিরীক্ষা গুলো কোনটাই একক ভাবে কোন সমস্যা নির্ণয় করতে পারে না। একটা নরমাল HSG টেস্টের মাধ্যমে হরমোনাল সমস্যা যেমন চিহ্নিত করা যায় না, তেমনি হরমোনের কোন টেস্ট দ্বারাও জরায়ুর গঠনগত ত্রুটি দেখা সম্ভব হয় না। তাই বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় চিকিৎসকেরা সবচেয়ে সঠিক ফলাফল পেতে জরায়ুর গঠনগত দিক ও হরমোনজনিত সমস্যার পরীক্ষা নিরীক্ষা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একি সময়ে করে থাকেন।
“এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে রচিত এবং এটি কোন পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।”
👁 ৩