Written by RajDoc Editorial Contributors
Reviewed by Dr. Tania Akhter Jahanকিডনি রোগ কেবল বয়স্কদের ব্যাধি—এমন একটি প্রচলিত ধারণা সমাজে বিদ্যমান থাকলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বর্তমান পরিসংখ্যান ভিন্ন চিত্র নির্দেশ করে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগটি একটি নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৪ জন শিশু কোনো না কোনো কিডনি জটিলতায় ভুগছে। শিশুদের এই স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে এবং সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলতে এর উপসর্গগুলো জানা এবং সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে সচেতনতা অবলম্বন করলে শিশুদের কিডনি রোগ অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
শিশুদের কিডনি রোগের লক্ষণগুলো তাদের বয়স এবং শারীরিক পরিবর্তনের সাথে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ বোঝার সুবিধার্থে একে কয়েকটি ভাগে বিন্যস্ত করা যায়:
নবজাতক পর্যায়: নবজাতকদের ক্ষেত্রে প্রধানত জন্মগত মূত্রনালী বা কিডনির ত্রুটি দেখা যায়। এর অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো শিশু স্বাভাবিকভাবে প্রস্রাব না করে ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব করা। এছাড়া শিশুর পেটের এক পাশে, দুই পাশে কিংবা তলপেটে কোনো অস্বাভাবিক মাংসপিণ্ড বা চাকা অনুভূত হলে তা কিডনি সমস্যার পূর্বলক্ষণ হতে পারে।
১ থেকে ৩ বছর বয়স: এই বয়সী শিশুদের মধ্যে মূত্রনালীর প্রদাহ বা ইউরিন ইনফেকশন (UTI) বেশি দেখা যায়। এর সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী বা ঘন ঘন জ্বর, ক্ষুধামন্দা, আশানুরূপ ওজন বৃদ্ধি না পাওয়া, রক্তস্বল্পতা, বমি, ডায়রিয়া এবং তলপেটে ব্যথা।
৩ থেকে ৬ বছর বয়স (নেফ্রোটিক সিন্ড্রোম): এই বয়সে 'নেফ্রোটিক সিন্ড্রোম' নামক কিডনি রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি লক্ষ্য করা যায়। এর প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে শিশুর চোখ-মুখ ফুলে যায় এবং পরবর্তীতে পুরো শরীর ফুলে যেতে পারে। একই সাথে শিশুর প্রস্রাব অস্বাভাবিক ঘোলাটে বা সাদাটে বর্ণ ধারণ করে।
অনেক সময় শিশুদের সাধারণ কিছু রোগ বা অসচেতনতার কারণে গুরুতর কিডনি জটিলতা তৈরি হয়:
ত্বক ও গলার ইনফেকশন: শিশুদের শরীরে খোস-পাঁচড়া (Scabies) বা গলা ব্যথা (Sore Throat) হলে এবং তার সঠিক চিকিৎসা না করা হলে, ২-৩ সপ্তাহ পর তা কিডনিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, প্রস্রাবের রঙ লালচে বা চায়ের রঙের মতো হওয়া, শরীর ফুলে যাওয়া এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো মারাত্মক উপসর্গ দেখা দেয়।
ভুল ব্যবস্থাপনায় ডায়রিয়া: শিশুদের ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও ইলেকট্রোলাইট কমে যায়। এই সময়ে সঠিক নিয়মে ও পরিমাণমতো ওরাল স্যালাইন না খাওয়ালে কিংবা ভুল পদ্ধতিতে (অতিরিক্ত ঘন বা পাতলা করে) স্যালাইন তৈরি করলে শিশুদের 'অ্যাকিউট কিডনি ফেইলিওর' (Acute Kidney Failure) বা আকস্মিক কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
শিশুদের কিডনির কার্যকারিতা স্বাভাবিক রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধে পরিবার ও অভিভাবকদের কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন:
১. সঠিক তরল ও স্যালাইন ব্যবস্থাপনা: ডায়রিয়া বা তীব্র জ্বরের সময় শিশুদের শরীরে পানির ঘাটতি পূরণে সঠিক নিয়মে তৈরি ওরাল স্যালাইন এবং পর্যাপ্ত তরল খাবার নিশ্চিত করতে হবে। ২. খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ: শিশুদের প্রক্রিয়াজাত বা টিনজাত খাবার, প্রিজারভেটিভযুক্ত খাদ্য এবং অতিরিক্ত কৃত্রিম রঙ ও ফ্লেভারযুক্ত বাইরের খাবার (যেমন- চিপস, ফাস্টফুড) থেকে দূরে রাখতে হবে। ৩. পর্যাপ্ত পানি পান: বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে এবং স্কুল চলাকালীন সময়ে শিশুরা যেন নিয়মিত ও পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ পানি পান করে, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ৪. প্রাথমিক ইনফেকশনের দ্রুত চিকিৎসা: শিশুর খোস-পাঁচড়া, চর্মরোগ বা টনসিলের সমস্যাকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্পন্ন করতে হবে। ৫. ওষুধ ব্যবহারে সতর্কতা: চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ বা প্রেসক্রিপশন ছাড়া শিশুদের কোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ, বিশেষ করে ব্যথানাশক (Painkiller) ওষুধ খাওয়ানো সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে।
শিশুদের কিডনি রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো অভিভাবকদের সচেতনতা ও সময়োচিত সিদ্ধান্ত। প্রস্রাবের রঙ বা পরিমাণের পরিবর্তন, হঠাৎ শরীর বা মুখ ফুলে যাওয়া কিংবা দীর্ঘমেয়াদী ইউরিন ইনফেকশনের লক্ষণ দেখামাত্রই কোনো প্রকার বিলম্ব না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং যথাযথ চিকিৎসাগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই কেবল শিশুদের কিডনি সুরক্ষিত রাখা এবং তাদের একটি সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।
ভিডিও লিংক: https://www.youtube.com/watch?v=XEuECN_XroA
এই পাতাটি ৮বার পড়া হয়েছে