Written by RajDoc Editorial Contributors
Reviewed by Dr. Alam Iftekhar Belayetপ্রচণ্ড গরমে বড়দের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে শিশুরা। এই সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং তারা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ আলম ইফতেখার বেলায়েত তীব্র গরমে শিশুদের সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী পরামর্শ দিয়েছেন। শিশুদের দৈনন্দিন যত্ন, খাবার-দাবারের সতর্কতা এবং রোগ বালাই প্রতিরোধে করণীয় বিষয়গুলো নিচে প্রবন্ধ আকারে আলোচনা করা হলো।
গরমের দিনে শিশুদের সুস্থ রাখার প্রথম শর্ত হলো সঠিক শারীরিক পরিচ্ছন্নতা। চিকিৎসকের মতে, শিশুকে প্রতিদিন স্বাভাবিক তাপমাত্রা অথবা হালকা কুসুম গরম পানি দিয়ে নিয়মিত গোসল করানো উচিত। গোসলের সময় শিশুর ঘাড়, বগল এবং শরীরের বিভিন্ন ভাঁজযুক্ত অংশগুলো খুব ভালো করে পরিষ্কার করতে হবে। কারণ এসব ভাঁজে ঘাম ও ময়লা জমে দ্রুত ফুসকুড়ি, চুলকানি বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন (ছত্রাকজনিত সংক্রমণ) দেখা দিতে পারে।
পাশাপাশি, গরমের এই সময়ে ডায়াপারের ব্যবহার যথাসম্ভব কমিয়ে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত সময় ডায়াপার পরিয়ে রাখলে আর্দ্রতা ও গরমের কারণে ফাঙ্গাল ইনফেকশন এবং মারাত্মক ডায়াপার র্যাশ হতে পারে। এর বিকল্প হিসেবে নরম ও পাতলা সুতি কাপড় ব্যবহার করা অনেক বেশি নিরাপদ।
গরমের সময় শিশুদের পেটের নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। তাই এই সময়ে শিশুদের কোনোভাবেই বাসি, খোলা বা ঠাণ্ডা খাবার দেওয়া যাবে না। সবসময় সহজে হজম হয় এমন তাজা এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো উচিত। বর্তমানে গরমের কারণে টাইফয়েড এবং জন্ডিসের (হেপাটাইটিস) মতো পানিবাহিত রোগের প্রকোপ অনেক বেড়ে গেছে, তাই শিশুর খাবার ও পানির উৎসের ব্যাপারে বাড়তি সজাগ থাকা প্রয়োজন।
সবচেয়ে সংবেদনশীল গ্রুপ হলো ০ থেকে ৬ মাস বয়সী নবজাতকেরা। এই বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতা খুব দ্রুত মারাত্মক রূপ নিতে পারে। তাই তাদের পিপাসা মেটাতে এবং সুস্থ রাখতে ঘন ঘন মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি ও তরল পাচ্ছে কি না, তা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তার প্রস্রাবের হিসাব রাখা। স্বাভাবিক অবস্থায় একটি সুস্থ শিশু দিনে ৬-৭ বার এবং রাতে ১-২ বার প্রস্রাব করে। এর চেয়ে কম প্রস্রাব হলে বুঝতে হবে শিশুটি পানিশূন্যতায় ভুগছে।
তীব্র গরমে শিশুদের ডায়রিয়ার প্রকোপ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। যদি কোনো শিশুর পাতলা পায়খানা শুরু হয়, তবে প্রতিবার মলত্যাগের পর নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমাণে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। তবে শুধু স্যালাইন খাইয়ে বসে থাকলে চলবে না; শিশুর শরীরে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতার কোনো বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যেমন—
শিশুর চোখ ভেতরের দিকে বসে যাওয়া।
গায়ের চামড়া কুঁচকে যাওয়া বা অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যাওয়া।
প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে যাওয়া।
এই ধরনের যেকোনো লক্ষণ প্রকাশ পেলে কোনো প্রকার দেরি না করে নিকটস্থ শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
শিশুকে সুস্থ রাখতে ঘরের পরিবেশের ভূমিকা অপরিসীম। স্যাঁতসেঁতে বা ভ্যাপসা পরিবেশ পরিহার করে শিশুকে এমন একটি কক্ষে রাখতে হবে যেখানে পর্যাপ্ত আলো এবং বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা (Cross ventilation) রয়েছে। ঘরের আদর্শ তাপমাত্রা ২৬° থেকে ২৮° সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা শিশুর শরীরের জন্য আরামদায়ক।
এছাড়া, গরমে শিশুরা খুব দ্রুত ঘেমে যায়। শরীর ঘেমে গেলে সেই ঘাম বসে গিয়ে সর্দি, কাশি এবং পরবর্তীতে মারাত্মক নিউমোনিয়ার মতো জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। তাই শিশু ঘেমে যাওয়া মাত্রই দ্রুত নরম কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে এবং সবসময় ঢিলেঢালা, আরামদায়ক ও শুকনো সুতি পোশাক পরিধান করাতে হবে।
ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে সামান্য অসচেতনতাও শিশুর জন্য বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তাই বাসি খাবার পরিহার করা, নিয়মিত গোসল, সুতি পোশাকের ব্যবহার এবং পানিশূন্যতা রোধে সতর্ক থাকার মাধ্যমেই এই তীব্র গরমেও শিশুকে সুস্থ ও হাসিখুশি রাখা সম্ভব। সর্বোপরি, শিশুর যেকোনো অস্বাভাবিক অসুস্থতায় ঘরোয়া টোটকার ওপর নির্ভর না করে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
ভিডিও লিংক https://www.youtube.com/watch?v=kxDUEFzyrnA
এই পাতাটি ৭৮বার পড়া হয়েছে