Written by RajDoc Editorial Contributors
Reviewed by Dr. Alam Iftekhar Belayetবর্তমান সময়ে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গু জ্বর। বড়দের তুলনায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে তাদের শারীরিক জটিলতা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সঠিক সময়ে ডেঙ্গুর লক্ষণ ও এর তীব্রতা বুঝতে পারা এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হলে যেকোনো বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। নবজাতক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু হলেই আতঙ্কিত না হয়ে এর শ্রেণীবিভাগ ও বিপজ্জনক লক্ষণগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা জরুরি।
চিকিৎসা ও রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণের সুবিধার্থে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডেঙ্গু জ্বরকে প্রধানত তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে:
১. ক্যাটাগরি 'A' (ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু): এই ক্যাটাগরির রোগীদের শরীরে কোনো বিপজ্জনক লক্ষণ বা 'Warning sign' থাকে না। এদের সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হয় না; চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতে রেখেই সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা সম্ভব।
২. ক্যাটাগরি 'B': যেসকল শিশুর ডেঙ্গু জ্বরের সাথে এক বা একাধিক বিপজ্জনক লক্ষণ (যেমন- অনবরত বমি, তীব্র পেট ব্যথা, বা প্লাটিলেট দ্রুত কমে যাওয়া) প্রকাশ পায়, তারা এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত।
৩. ক্যাটাগরি 'C' (সিভিয়ার ডেঙ্গু): এটি ডেঙ্গুর সবচেয়ে মারাত্মক পর্যায়। এতে শিশু শকে (Shock) চলে যেতে পারে কিংবা তার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন—ব্রেন, কিডনি, ফুসফুস ও হার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'Expanded Dengue Syndrome' বলা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: ক্যাটাগরি 'B' এবং 'C' তে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অবহেলা না করে অনতিবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি করে নিবিড় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলো বড়দের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন বা তীব্র হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
তীব্র ও বাইফেজিক জ্বর: হঠাৎ করে শরীর ১০২ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উত্তপ্ত হতে পারে। ডেঙ্গুর এই জ্বরটি সাধারণত দিনে দুবার করে বাড়ে এবং সহজে স্বাভাবিক অবস্থায় নামতে চায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘Biphasic Fever’ বলা হয়।
শরীরে তীব্র ব্যথা: শিশু চোখের ভেতরে এবং চোখের পেছনের অংশে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করে। সেই সাথে শরীরের বিভিন্ন জোড় বা জয়েন্টে তীব্র ব্যথা ও পেশিতে খিঁচুনি হতে পারে।
ত্বকে র্যাশ বা দানা: জ্বর আসার ৩ থেকে ৪ দিনের মাথায় শিশুর শরীরে লালচে রঙের র্যাশ বা দানা দেখা দিতে পারে।
চরম অবসাদ: শিশু প্রচণ্ড ক্লান্ত, নিস্তেজ ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং খাওয়া-দাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে।
যদি শিশু ক্যাটাগরি 'A' ভুক্ত হয়, তবে বাসায় নিচের নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে:
পূর্ণ বিশ্রাম ও স্পঞ্জিং: শিশুকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। শরীরের তাপমাত্রা কমানোর জন্য সাধারণ বা কুসুম গরম পানি দিয়ে বারবার পুরো শরীর ভালোভাবে স্পঞ্জ বা মুছে দিতে হবে।
পর্যাপ্ত তরল খাবার: ডেঙ্গু চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তরল উপাদানের ভারসাম্য বজায় রাখা। শিশুকে প্রচুর পরিমাণে খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, ডালিম বা লেবুর রস এবং স্বাভাবিক তরল খাবার খাওয়াতে হবে।
সঠিক নিয়মে প্যারাসিটামল: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কেবল মাত্র প্যারাসিটামল গ্রুপের ওষুধ দেওয়া যাবে। শিশুর বয়স ও ওজন ভেদে এর ডোজ নির্ধারিত হয়। সাধারণ পরিমাপ হিসেবে—১ বছরের নিচের শিশুর জন্য আধা চামচ, ১ থেকে ৪ বছর বয়সীদের জন্য ১ চামচ এবং ৪ বছরের ঊর্ধ্বের শিশুদের জন্য ২ চামচ করে প্যারাসিটামল সিরাপ প্রতি ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা পরপর (জ্বর থাকলে) দেওয়া যেতে পারে। তবে যেকোনো ওষুধ সেবনের পূর্বে চূড়ান্ত ডোজ চিকিৎসকের কাছ থেকে নিশ্চিত করে নেওয়া আবশ্যক।
ভুল চিকিৎসার কারণে অনেক সময় সাধারণ ডেঙ্গুও প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে। তাই নিচের বিষয়গুলো কঠোরভাবে বর্জন করতে হবে:
ব্যথানাশক নিষিদ্ধ: রোগীকে কোনো অবস্থাতেই অ্যাসপিরিন (Aspirin), আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ বা ক্লোফেনাক সাপোজিটরি (Clofenac Suppository) দেওয়া যাবে না। এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড: চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে কোনো ধরনের স্টেরয়েড বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যেখানে প্রাথমিক অবস্থায় অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই।
শিশুর জ্বর আসার পর চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক সময়ে রক্ত পরীক্ষা করা জরুরি। সাধারণত জ্বরের প্রথম ৫ দিনের মধ্যে NS1 (এন্টিজেন) পরীক্ষা এবং জ্বর আসার ৭ দিন পার হলে IgM/IgG (এন্টিবডি) পরীক্ষা করার নিয়ম।
উপসংহার
শিশুদের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই সুস্থতার চাবিকাঠি। লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে কোনো ধরণের কবিরাজি বা হাতুড়ে চিকিৎসার আশ্রয় না নিয়ে, রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। সচেতনতা, সঠিক পরিচর্যা এবং চিকিৎসকের নির্দেশনাবলী অক্ষরে অক্ষরে পালন করার মাধ্যমেই শিশুকে ডেঙ্গুর হাত থেকে নিরাপদ রাখা সম্ভব।
ভিডিও লিংক https://www.youtube.com/watch?v=QpMaBlrqVfM
এই পাতাটি ৬৬বার পড়া হয়েছে