বারবার গর্ভপাত বা সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারন গুলো কী?
Share on

বারবার গর্ভপাত বা সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারন গুলো কী?

গর্ভপাত মানেই যথেষ্ট বেদনাদায়ক একটা বিষয়, কিন্তু যে সব দম্পতিরা বারবার এই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন তাদের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

 

-কেন বারবার এমন ঘটছে?

-আমার কি কোন সমস্যা আছে?

-আমি কি কোনদিন গর্ভধারণ করে সন্তান জন্ম দিতে পারবো?

 

এমন হাজারো প্রশ্ন তাদের মনে ঘুরপাক খেতে থাকে। ব্যাপারটা আসলে যতটা জটিল মনে হয়, বাস্তবতা সে তুলনায় ভিন্ন। এই সমস্যার মূল কারণ যদি শনাক্ত করা যায়, তবে এই সমস্যার চিকিৎসা ও সমাধানের পথ খুব সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়।

 

পুনরাবৃত্ত গর্ভপাত বলতে কি বোঝায়?

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, পুনরাবৃত্ত গর্ভপাত বলতে সাধারণত পর পর দুই বা ততোধিক গর্ভপাতকে বোঝায়, যা সাধারণত গর্ভাবস্থার ২০ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই ঘটে থাকে। গর্ভপাত মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে একটি কষ্টদায়ক ব্যাপার হলেও, এটা খুবই সাধারণ একটা ঘটনা। আনুমানিক ১০-২০% গর্ভধারণের ক্ষেত্রে গর্ভপাত ঘটে থাকে, তবে সেটা সাধারণত একবার ঘটতে পারে। যদি বারবার এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে তবে ধরে নিতে হবে যে, এটি কোন অন্তর্নিহিত সমস্যার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

বারবার গর্ভপাতের আসল কারণ?

 

জিনগত এবং ক্রোমোজোমীয় অস্বাভাবিকতা

পুনরাবৃত্ত বা অন্য যে কোন ধরনের অকাল গর্ভপাতের সবচেয়ে কমন কারণ হলো ভ্রূণের মধ্যে ক্রোমোজোমীয় অস্বাভাবিকতা। স্বামী বা স্ত্রীর বয়স বাড়ার সাথে সাথে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুতে জিনগত ত্রুটি দেখা দিতে পারে, যার ফলে ভ্রূণের বিকাশ সঠিকভাবে ঘটতে নাও পারে। কিছু ক্ষেত্রে, বাবা বা মা যে কোন একজন বা উভয়ের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ক্রোমোজোমীয় পুনর্বিন্যাস (যেমন- Translocation) থাকে, যা তাদের নিজেদের শরীরের উপর প্রভাব ফেলে না, কিন্তু ভ্রূণের গর্ভপাতের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করে।

 

জরায়ুর গঠনগত অস্বাভাবিকতা

গর্ভাবস্থা টিকিয়ে রাখতে জরায়ুর আকৃতি ও গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেসব অবস্থা জরায়ুর গহ্বরকে বিকৃত করে, সেগুলো ভ্রূণের প্রতিস্থাপনে বা ক্রমবর্ধমান ভ্রূণের বৃদ্ধিকে সীমিত করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে -

 

হরমোনের ভারসাম্যহীনতা

একটি সফল গর্ভাবস্থা একটি সুনির্দিষ্ট হরমোনীয় পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। বারবার গর্ভপাতের হরমোন গত সাধারণ কারণ গুলোর মধ্যে রয়েছে:

 

Antiphospholipid Syndrome (APS) এবং রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা

APS হলো একটি Autoimmune অবস্থা, যেখানে শরীর এমন অ্যান্টিবডি তৈরি করে যা প্লাসেন্টায় রক্ত সরবরাহকারী ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলোতে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এই জমাট বাঁধা রক্ত ভ্রূণের বিকাশমান রক্তপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যার ফলশ্রুতিতে বার বার গর্ভপাত হতে পারে। রক্ত জমাট বাঁধার অন্যান্য বংশগত সমস্যা (Thrombophilias) একি ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

 

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কিত কারণ সমূহ

কিছু ক্ষেত্রে মায়ের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভ্রূণ কে ক্ষতিকর হিসেবে শনাক্ত করে ভ্রূণের সঠিক প্রতিস্থাপন ও প্লাসেন্টার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। যদিও এই বিষয়ে এখনো গবেষণা চলমান রয়েছে, কিছু কিছু মহিলাদের ক্ষেত্রে এমন ব্যাখ্যাতীত গর্ভপাত ঘটতে পারে এমন মতবাদ ক্রমবর্ধমান স্বীকৃত হচ্ছে ।

 

ইনফেকশন

কিছু নির্দিষ্ট ইনফেকশন, গর্ভধারণের সময় বা গর্ভাবস্থার প্রথমদিকে হয়ে থাকলে গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা করা হয়নি এমন যৌন বাহিত ইনফেকশন, ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজিনোসিস এবং জরায়ুর আস্তরণকে প্রভাবিত করতে পারে এমন অন্যান্য ইনফেকশন।

 

লাইফস্টাইল ও পরিবেশ গত কারন

বেশ কিছু লাইফস্টাইল ও পরিবেশ সম্পর্কিত বিষয় গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় -

 

পুরুষের কারনে সৃষ্ট সমস্যা

যদিও গর্ভপাত নারীর শরীরে ঘটে, তবুও অনেক ক্ষেত্রেই গর্ভপাতের জন্য পিতাও দায়ী থাকে। শুক্রাণুর গুণমান ভ্রূণের স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। শুক্রাণুর DNA এর দুর্বলতা, পিতার বয়স বেশি, ধূমপান বা বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শ ভ্রূণের ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

 

কারন হীন বার বার গর্ভপাত

পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা সত্ত্বেও ৫০ শতাংশ পুনরাবৃত্ত গর্ভপাতের কোনো সুস্পষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

 

কারন কিভাবে শনাক্ত করা হয়

 

বারবার গর্ভপাতের জন্য সাধারণত যেসকল পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়:

 

 

চিকিৎসা ও করনীয়

 

উপসংহার

নিঃসন্দেহে গর্ভপাত একটা বেদনাদায়ক ঘটনা, এবং বার বার এই ট্রমার মধ্যে দিয়ে যারা যান তাদের জন্য সবকিছু অনেক বেশি কঠিন মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সঠিক সময়ে কারন শনাক্ত করে উপযুক্ত পদক্ষেপ ও চিকিৎসা নিলে সাধারণত এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব, সফল গর্ভধারণের মাধ্যমে সন্তানের বাবা মা হওয়াও সম্ভব। প্রয়োজন শুধু ধৈর্য ধারণ, পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি ও সঠিক গাইডলাইনের।

 

“এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে রচিত এবং এটি পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।”

 

 

 

👁 ১০

স্বাস্থ্য প্রবন্ধ