চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্রমাগত উন্নতির ফলে চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতি। একসময় ধারণা করা হতো বাত-ব্যথা সম্পূর্ণরূপে সেরে যায় না এবং রোগীকে আজীবন তীব্র ব্যথানাশক ওষুধ খেয়েই পার করতে হবে। কিন্তু বর্তমান যুগে বাত-ব্যথার চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটেছে। আধুনিক 'ইন্টারভেনশনাল রিউমাটোলজি' এবং 'রিজেনারেটিভ মেডিসিন' বাতের রোগীদের কোনো প্রকার বড় কাটাছেঁড়া বা জটিল অস্ত্রোপচার ছাড়াই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনছে।
আধুনিক বাতের চিকিৎসার অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো সার্জারি বা কোনো ধরনের কাটাছেঁড়া ব্যতিরেক রোগ নিরাময়ের প্রচেষ্টা। ইন্টারভেনশনাল রিউমাটোলজিস্টগণ এখন কেবল রোগীর ব্যথা সাময়িকভাবে প্রশমিত করার দিকেই নজর দেন না, বরং রোগটি যাতে গোড়া থেকে নিরাময়ের দিকে যায় সেই আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রদান করেন।
আধুনিক চিকিৎসায় বাত রোগের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে মূলত দুটি প্রধান ধারায় চিকিৎসা দেওয়া হয়ে থাকে:
১. অটোইমিউন বাতের চিকিৎসায় 'টার্গেটেড ইমিউনোথেরাপি'
গেঁটে বাত (রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস), স্পন্ডাইলো আর্থ্রাইটিস, কোমরে ব্যথা (কোটিবাত) কিংবা মহিলাদের লুপাস বা এসএলই (SLE)-এর মতো রোগগুলো মূলত শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ত্রুটি বা অটোইমিউন সমস্যার কারণে হয়।
অতীতের চিকিৎসা বনাম বর্তমান: অতীতে এই ধরনের রোগের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট বা টার্গেটেড চিকিৎসা ছিল না। চিকিৎসকেরা ঢালাও বা গণহারে স্টেরয়েড ব্যবহার করতেন এবং পুরো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দমন করে রাখতেন। এর ফলে ওষুধের মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিত, এমনকি রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকত।
আধুনিক সমাধান: বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসার কল্যাণে ক্ষতিকর স্টেরয়েডের পরিবর্তে অত্যাধুনিক ইমিউনোথেরাপি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এটি শরীরের অন্য কোনো ক্ষতি না করে কেবল সুনির্দিষ্ট ত্রুটিপূর্ণ কোষকে লক্ষ্য করে কাজ করে। বাংলাদেশে বর্তমানে রোগীদের সামর্থ্য অনুযায়ী স্বল্প, মধ্যম ও উচ্চ—সব ধরনের ব্যয়েই এই আধুনিক ইমিউনোথেরাপি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
২. ক্ষয়বাতের চিকিৎসায় 'স্টেম সেল থেরাপি'
৩৫ বছর ঊর্ধ্ব বয়সীদের ক্ষেত্রে কিংবা খেলোয়াড়দের ইনজুরির কারণে জয়েন্টের ভেতরের কার্টিলেজ বা তরুণাস্থি ক্ষয়ে গিয়ে যে 'ক্ষয়বাত' বা অস্টিওআর্থ্রাইটিস হয়, তার চিকিৎসায় স্টেম সেল থেরাপি এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।
স্টেম সেল সংগ্রহ ও প্রয়োগ: এই পদ্ধতিতে রোগীর নিজস্ব শরীরের অস্থিমজ্জা (Bone Marrow) এবং পেটের চর্বি থেকে অথবা নবজাতক শিশুর নাভির রজ্জু থেকে স্টেম সেল সংগ্রহ করা হয়।
জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট রোধ: সংগৃহীত এই স্টেম সেলগুলো প্রক্রিয়াজাত করে ক্ষতিগ্রস্ত জয়েন্টে প্রয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদীভাবে ক্ষয় নিরাময় করা সম্ভব হচ্ছে। এই আধুনিক থেরাপির মাধ্যমে রোগীরা অতি কাছাকাছি বা শতভাগ নিরাময় লাভ করতে পারছেন এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল 'জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট' বা হাঁটু প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশেই ফুরিয়ে আসছে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। চিকিৎসকদের মতে, বাতের আধুনিক ও উচ্চ ব্যয়ের চিকিৎসা থেকে নিজেকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই দ্রুত রোগ নির্ণয় করা এবং সঠিক জীবনাচরণ মেনে চলা। এর মধ্যে রয়েছে:
খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং কেমিক্যালের বিষক্রিয়া বা পলিউশন এড়িয়ে চলা।
তাজা ও অর্গানিক খাদ্য গ্রহণ করা এবং পোড়া মাংস বা চারকোল জাতীয় খাবার বর্জন করা।
শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ধূমপান ও মদ্যপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে বিরত থাকা।
নিয়মিত এক্সারসাইজ বা শরীরচর্চা করার মাধ্যমে নিজেকে সবসময় একটিভ বা কর্মক্ষম রাখা।
বাত-ব্যথার আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি আজ আমাদের দেশেই অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে পেইন কিলার বা স্টেরয়েড কিনে খাওয়ার মতো কুসংস্কার পরিহার করে, প্রাথমিক অবস্থায় আধুনিক ইমিউনোথেরাপির কিংবা স্টেম সেল থেরাপির মতো চিকিৎসার ছোঁয়া পেলে বাতের রোগীরাও পেতে পারেন একটি সচল ও সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত সুন্দর জীবন।
ভিডিও লিংক https://www.youtube.com/watch?v=iAuvYx10Bzs
এই পাতাটি ৭বার পড়া হয়েছে