বাত-ব্যথার কারণ ও লক্ষণ
Share on

বাত-ব্যথার কারণ ও লক্ষণ

মানবদেহের অস্থিসন্ধি বা জয়েন্টের যত রকমের জটিলতা রয়েছে, তার মধ্যে বাত-ব্যথা অন্যতম প্রধান ও কষ্টদায়ক। সাধারণ মানুষের মাঝে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, যেকোনো ধরনের গিটে গিটে বা জোড়ায় জোড়ায় ব্যথাই হলো বাত। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় সব ব্যথাই বাত নয়। বাত রোগ মূলত একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নের দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যা, যা কেবল হাড় বা জয়েন্টকেই আক্রান্ত করে না, বরং শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এই রোগের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে বাত-ব্যথার অন্তর্নিহিত কারণ ও এর বিচিত্র লক্ষণগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

বাত-ব্যথার প্রধান কারণসমূহ

চিকিৎসকদের মতে, বাত রোগের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু জৈবিক, বয়সজনিত এবং পরিবেশগত কারণ রয়েছে। উৎস ও প্রকৃতি অনুযায়ী বাতের প্রধান কারণগুলোকে নিচে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হলো:

১. অটোইমিউন ত্রুটি : বাতের সবচেয়ে বড় এবং জটিল কারণ হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বা ইমিউন সিস্টেমের ত্রুটি। আমাদের ইমিউন সিস্টেমের কাজ হলো বাইরের জীবাণু থেকে শরীরকে রক্ষা করা। কিন্তু কোনো অজানা কারণে এই সিস্টেম যখন বিভ্রান্ত হয়ে নিজের সুস্থ কোষ ও অস্থিসন্ধিগুলোকে শত্রু মনে করে আক্রমণ করে, তখন তাকে 'অটোইমিউন রোগ' বলা হয়। একে চিকিৎসকেরা "ঘরের শত্রু বিভীষণ"-এর সাথে তুলনা করেন। এই আক্রমণের ফলে জয়েন্টগুলোতে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং তীব্র প্রদাহের সৃষ্টি হয়। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (গেঁটে বাত), স্পন্ডাইলো আর্থ্রাইটিস এবং লুপাস বা এসএলই (SLE) এই কারণেই হয়ে থাকে।

২. বয়সজনিত ক্ষয় এবং তরল শুকিয়ে যাওয়া: বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানবদেহের অস্থিসন্ধিগুলোর ভেতরের 'কার্টিলেজ' বা তরুণাস্থি স্বাভাবিকভাবেই ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। একই সাথে জয়েন্টের ভেতরের পিচ্ছিল তরল পদার্থ (Lubricant) শুকিয়ে যায়। হাড়ের এই ক্ষয়জনিত কারণে যে বাতের সৃষ্টি হয়, তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে 'অস্টিওআর্থ্রাইটিস' বা 'ক্ষয়বাত' বলা হয়। সাধারণত ৩৫ বছরের ঊর্ধ্বের মানুষের ক্ষেত্রে এই কারণটি বেশি কার্যকর হয়।

৩. আঘাত বা স্পোর্টস ইনজুরি : অনেক সময় বয়সের আগেই বা অল্প বয়সে বাত-ব্যথার সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে খেলোয়াড় বা ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রে খেলাধুলার সময় জয়েন্টে, লিগামেন্টে বা টেন্ডনে বড় কোনো আঘাত লাগলে কিংবা জয়েন্ট স্থানচ্যুত হলে সেখানে অগ্রিম ক্ষয়বাত দেখা দেয়।

৪. রক্তে বর্জ্য পদার্থ বা ইউরিক এসিডের বৃদ্ধি: শরীরের বিপাক প্রক্রিয়ার ত্রুটির কারণে যদি রক্তে ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ, বিশেষ করে ইউরিক এসিডের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তবে তা ক্রিস্টাল বা দানা আকারে জয়েন্টগুলোতে জমা হতে থাকে। এটি পরবর্তীতে তীব্র বাতের ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

৫. ভিটামিনের ঘাটতি: দেহে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের অভাব, বিশেষ করে ভিটামিন ডি এর মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেলে হাড় ও জয়েন্ট দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বাত-ব্যথার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৬. ঝুঁকিপূর্ণ জীবনাচরণ ও পরিবেশগত প্রভাব: আধুনিক যুগে আমাদের জীবনযাত্রার কিছু ভুল অভ্যাস বাতের কারণকে ত্বরান্বিত করে। যেমন: খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা রাসায়নিক বিষক্রিয়ার উপস্থিতি, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা (যা জয়েন্টের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে), ধূমপান, মদ্যপান এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বা শরীরচর্চা না করা।

বাত-ব্যথার সুনির্দিষ্ট লক্ষণসমূহ

বাত রোগকে অন্য সাধারণ ব্যথা থেকে আলাদা করার জন্য এর লক্ষণগুলোর দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। বাতের লক্ষণগুলোকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়: প্রাথমিক জয়েন্ট সংক্রান্ত লক্ষণ এবং পদ্ধতিগত বা সিস্টেমিক লক্ষণ।

ক. প্রাথমিক ও জয়েন্ট সংক্রান্ত লক্ষণসমূহ:

খ. সিস্টেমিক বা অভ্যন্তরীণ অঙ্গের লক্ষণসমূহ 

অটোইমিউন বাতের ক্ষেত্রে ব্যথা ছাড়াও শরীরে কিছু বিচিত্র এবং মারাত্মক লক্ষণ প্রকাশ পায়, যা অনেকেই বাতের লক্ষণ হিসেবে প্রথমে বুঝতে পারেন না:

রোগ নির্ণয়ে অসচেতনতা ও বিলম্বে আসার ঝুঁকি

বাত-ব্যথার লক্ষণগুলো দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই সচেতন হওয়া জরুরি। আমাদের সমাজে রোগীরা প্রায়শই লক্ষণগুলোকে সাধারণ ব্যথা মনে করে ফার্মেসি থেকে পেইন কিলার বা হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছ থেকে ক্ষতিকর স্টেরয়েড ওষুধ কিনে খান। এতে লক্ষণগুলো সাময়িকভাবে চাপা পড়ে থাকে, কিন্তু ভেতরের মূল কারণটি ধ্বংস হয় না। দীর্ঘমেয়াদী এই ভুলের কারণে রোগ নির্ণয় হতে অনেক দেরি হয়ে যায় এবং ততদিনে অস্থিসন্ধিগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষয়ে যায় বা জোড়া লেগে অকেজো হয়ে পড়ে।

উপসংহার

বাত-ব্যথা কেবল একটি সাধারণ শারীরিক কষ্ট নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত ব্যাধি যা সঠিক সময়ে চিহ্নিত না হলে মানুষের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা কেড়ে নেয়। এর পেছনে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ত্রুটি থেকে শুরু করে বয়স, আঘাত এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনাচরণ দায়ী। সকালে জয়েন্টের জড়তা, বিশ্রাম নিলে ব্যথা বাড়া কিংবা ব্যথার সাথে দীর্ঘমেয়াদী জ্বর বা মুখের ঘার মতো লক্ষণ দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। বাতের কারণ ও লক্ষণগুলো সম্পর্কে সঠিক সময়ে সচেতনতা এবং পেইন কিলারের অপব্যবহার রোধ করার মাধ্যমেই কেবল এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে জয়েন্ট ও শরীরকে রক্ষা করা সম্ভব।

ভিডিও লিংক https://www.youtube.com/watch?v=iAuvYx10Bzs

এই পাতাটি ৮বার পড়া হয়েছে

স্বাস্থ্য প্রবন্ধ