পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া, দীর্ঘদিন ধরে পাতলা পায়খানা হওয়া কিংবা বারবার পেটের সমস্যাকে অনেকেই সাধারণ আমাশয় বা অন্ত্রের সংক্রমণ বলে মনে করেন। তবে এসব উপসর্গের পেছনে কখনও কখনও লুকিয়ে থাকতে পারে আলসারেটিভ কোলাইটিস (Ulcerative Colitis - UC) নামের একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ। যথাসময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা না হলে এটি রোগীর জীবনযাত্রার মানকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
আলসারেটিভ কোলাইটিস হলো বৃহদান্ত্র (Colon) ও মলাশয় (Rectum)-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগ, যা Inflammatory Bowel Disease (IBD)-এর অন্তর্ভুক্ত। এ রোগে অন্ত্রের অভ্যন্তরীণ আবরণে প্রদাহ ও ক্ষত (Ulcer) সৃষ্টি হয়, যার ফলে বিভিন্ন পরিপাকতন্ত্র-সংক্রান্ত উপসর্গ দেখা দেয়। এটি কোনো সংক্রামক রোগ নয় এবং একজনের কাছ থেকে অন্যজনের মধ্যে ছড়ায় না।
আলসারেটিভ কোলাইটিসের সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে বারবার পাতলা পায়খানা, পায়খানার সঙ্গে রক্ত বা মিউকাস নির্গমন, ঘন ঘন পায়খানার বেগ অনুভব করা, পেটব্যথা বা পেট মোচড়ানো, ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা এবং রক্তস্বল্পতা। কিছু ক্ষেত্রে জ্বরও দেখা দিতে পারে। রোগের তীব্রতা ও বিস্তৃতির ওপর নির্ভর করে উপসর্গের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।
আলসারেটিভ কোলাইটিস কেবল অন্ত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক রোগীর ক্ষেত্রে শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও এর প্রভাব দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে হাঁটু বা অন্যান্য জয়েন্টে ব্যথা ও ফোলা, চোখ লাল হওয়া বা ব্যথা, ত্বকে বিভিন্ন ধরনের র্যাশ এবং মুখে ঘা। এসব উপসর্গ দেখা দিলে রোগের সামগ্রিক মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা মূল্যায়নের পাশাপাশি কোলোনোস্কপি, বায়োপসি, রক্ত পরীক্ষা, মল পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন। আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ রোগীর রোগ সফলভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। রোগের ধরন ও তীব্রতার ভিত্তিতে চিকিৎসায় মেসালাজিন (Mesalamine), স্টেরয়েড, ইমিউনোমডুলেটর, বায়োলজিক থেরাপি এবং বিশেষ ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ফলো-আপ ও নিয়মিত ওষুধ সেবন প্রয়োজন হয়। তাই ঘন ঘন রক্তমিশ্রিত পায়খানা, তীব্র পেটব্যথা, জ্বর, দ্রুত ওজন হ্রাস, অতিরিক্ত দুর্বলতা, রক্তস্বল্পতা, বমি বা খাবার গ্রহণে অসুবিধার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়, নিয়মিত চিকিৎসা এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চললে অধিকাংশ আলসারেটিভ কোলাইটিস রোগী স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে সক্ষম হন।
— ডা. মোঃ মোবাসসিরুল ফেরদৌস
এমবিবিএস (এসএসএমসি), বিসিএস (স্বাস্থ্য)
এমডি (গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি), এমএসিপি (আমেরিকা)
পরিপাকতন্ত্র, লিভার, পিত্তথলি ও প্যানক্রিয়াস রোগ বিশেষজ্ঞ এবং থেরাপিউটিক এন্ডোস্কোপিস্ট