ডায়াবেটিস এখন শুধু বয়স্কদের রোগ নয়। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, অতিরিক্ত মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে অনেক কম বয়সী মানুষও আজ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে রয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক সময় শরীরে ডায়াবেটিসের লক্ষণ স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। কেউ হয়তো দীর্ঘদিন ধরে দুর্বলতা, অতিরিক্ত পিপাসা বা ঘন ঘন প্রস্রাবের মতো সমস্যায় ভুগছেন, কিন্তু বুঝতেই পারছেন না এর পেছনে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ার বিষয়টি জড়িত।
এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকেরা কিছু বিশেষ পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT)। নামটি কিছুটা জটিল শোনালেও পরীক্ষাটি আসলে খুব সাধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ।
OGTT কী?
ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট বা OGTT হলো এমন একটি পরীক্ষা, যার মাধ্যমে দেখা হয় শরীর কতটা ভালোভাবে গ্লুকোজ বা চিনি ব্যবহার করতে পারছে। সহজভাবে বললে, খাবার খাওয়ার পর রক্তে যে শর্করা বাড়ে, শরীর সেটিকে কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে—এই পরীক্ষায় সেটিই বোঝা যায়।
ডায়াবেটিস নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এটি বেশ নির্ভরযোগ্য একটি পরীক্ষা হিসেবে ধরা হয়। বিশেষ করে যাদের রক্তে শর্করার মাত্রা সীমার কাছাকাছি থাকে বা সাধারণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায় না, তাদের ক্ষেত্রে OGTT অনেক কার্যকর।
কেন এই পরীক্ষা করা হয়?
চিকিৎসকেরা সাধারণত কয়েকটি কারণে OGTT করার পরামর্শ দেন। যেমন—
অনেক সময় দেখা যায়, খালি পেটে রক্তের সুগার স্বাভাবিক থাকলেও খাবারের পরে তা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এই ধরনের সমস্যা ধরতে OGTT খুবই উপকারী।
কীভাবে পরীক্ষা করা হয়?
OGTT করার আগে সাধারণত ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা খালি পেটে থাকতে হয়। সকালে ল্যাবে গিয়ে প্রথমে খালি পেটে রক্ত নেওয়া হয়। এরপর রোগীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্লুকোজ মেশানো মিষ্টি পানীয় খেতে দেওয়া হয়।
পানীয়টি খাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময় পরপর আবার রক্ত পরীক্ষা করা হয়। সাধারণত ২ ঘণ্টা পরে রক্তে শর্করার মাত্রা দেখা হয়। কিছু ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে।
পরীক্ষার সময় ধূমপান, হাঁটাচলা বা ভারী কাজ এড়িয়ে চলতে বলা হয়, কারণ এগুলো ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
গর্ভাবস্থায় OGTT কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গর্ভাবস্থায় অনেক নারীর শরীরে হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এটিকে বলা হয় গর্ভকালীন ডায়াবেটিস।
এই সমস্যা শুরুতে অনেক সময় কোনো লক্ষণ তৈরি করে না। কিন্তু নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মা ও শিশুর উভয়ের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। শিশুর অতিরিক্ত ওজন, সময়ের আগে প্রসব কিংবা ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই গর্ভাবস্থার নির্দিষ্ট সময়ে অনেক নারীকে OGTT করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে ঝুঁকি আগে থেকেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
পরীক্ষার ফলাফল কী বোঝায়?
OGTT-এর ফলাফল দেখে চিকিৎসক বুঝতে পারেন—
তবে শুধু রিপোর্ট দেখে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ বয়স, ওজন, গর্ভাবস্থা বা অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ফলাফলের ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে।
পরীক্ষার আগে কী কী বিষয় খেয়াল রাখা দরকার?
OGTT করার আগে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা জরুরি—
অনেকেই মনে করেন পরীক্ষার আগে কম খেলে রিপোর্ট ভালো আসবে। আসলে এমন করলে ফলাফল সঠিক নাও হতে পারে।
ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক সময় শরীর আগে থেকে স্পষ্ট সংকেত দেয় না। তাই ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত পরীক্ষা করানো খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট বা OGTT এমনই একটি পরীক্ষা, যা শরীরের ভেতরের লুকানো সমস্যাও ধরতে সাহায্য করে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, অতিরিক্ত ওজনের মানুষ বা পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে এই পরীক্ষার গুরুত্ব আরও বেশি।
নিজের শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনকে অবহেলা না করে সময়মতো পরীক্ষা ও সচেতনতা—এ দুটোই পারে সুস্থ জীবনের পথ সহজ করতে।
👁 ৭১