আমাদের দেশে এখন এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেখানে অন্তত একজন ডায়াবেটিসের রোগী নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, ডায়াবেটিস এখন বিশ্বজুড়ে এক নীরব মহামারি। দিন দিন এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে রোগটি সম্পর্কে সঠিক ও স্পষ্ট ধারণা থাকা আমাদের সবার জন্যই অত্যন্ত জরুরি।
সহজ কথায়, ডায়াবেটিস এমন একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ যা শরীর থেকে কখনো পুরোপুরি সারে না বা চিরতরে নির্মূল করা যায় না; তবে সঠিক নিয়মের মধ্যে থাকলে এটিকে শতভাগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং একজন ডায়াবেটিস রোগীও একদম স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।
ডায়াবেটিস কেন হয় এবং শরীরে এটি কীভাবে কাজ করে?
আমরা প্রতিদিন যে ভাত, রুটি বা শর্করাজাতীয় খাবার খাই, তা হজম হওয়ার পর মূলত গ্লকোজ বা চিনিতে পরিণত হয়ে আমাদের রক্তে মিশে যায়। আমাদের শরীরে ইনসুলিন নামের একটি হরমোন থাকে, যা তৈরি হয় অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস থেকে। ইনসুলিনের মূল কাজ হলো রক্তে থাকা এই গ্লুকোজকে টেনে শরীরের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে দেওয়া। কোষগুলো তখন সেই গ্লকোজকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে শক্তি তৈরি করে, যা দিয়ে আমরা প্রতিদিনের কাজকর্ম, হাঁটাচলা বা পরিশ্রম করি।
যখন কোনো মানুষের শরীরে এই ইনসুলিন হরমোন তৈরি হওয়া কমে যায়, অথবা তৈরি হলেও তা শরীরের কোষে ঠিকমতো কাজ করতে পারে না—তখন রক্তে থাকা গ্লকোজ আর কোষে ঢুকতে পারে না। ফলে রক্তে গ্লকোজ বা চিনির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় রক্তে সুগারের এই অতিরিক্ত মাত্রাকেই ডায়াবেটিস বলা হয়।
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের নীরব ক্ষতি
রক্তে সুগার অনেক বেড়ে গেলে শরীর তখন প্রস্রাবের মাধ্যমে অতিরিক্ত গ্লকোজ বাইরে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এই কারণে ডায়াবেটিস রোগীদের ঘন ঘন প্রস্রাব হয়। আর শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যাওয়ার ফলে রোগী তীব্র পানির তৃষ্ণা অনুভব করেন।
অন্যদিকে, শরীরের কোষগুলো প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ বা জ্বালানি না পাওয়ায় শরীর পর্যাপ্ত শক্তি পায় না। ফলে রোগী সবসময় প্রচণ্ড দুর্বলতা ও ক্লান্তি অনুভব করেন।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা: ডায়াবেটিস যদি সময়মতো ধরা না পড়ে বা নিয়ন্ত্রণে রাখা না হয়, তবে তা রক্তের নালি ও স্নায়ুগুলোকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে পরবর্তীতে হৃৎপিণ্ড (হার্ট অ্যাটাক), কিডনি বিকল হওয়া, চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানো এবং পায়ের পাতায় মারাত্মক ক্ষত (গ্যাংগ্রিন)-সহ নানাবিধ শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ডায়াবেটিসের প্রধান লক্ষণগুলো কী কী?
আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের গাইডলাইন অনুযায়ী, নিচে উল্লেখ করা লক্ষণগুলোর কোনো একটি নিজের বা পরিবারের কারও মধ্যে দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত রক্তের সুগার পরীক্ষা (Blood Sugar Test) করানো উচিত:
ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া: বিশেষ করে রাতের বেলা বারবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া এবং এর কারণে ঘুম ভেঙে যাওয়া।
অতিরিক্ত তেষ্টা পাওয়া: গলা শুকিয়ে আসা এবং বারবার পানি খাওয়ার পরেও তৃষ্ণা না মেটা।
ঘন ঘন ক্ষুধা লাগা: অল্প সময় পরপর তীব্র ক্ষুধা লাগা এবং পর্যাপ্ত খাওয়ার পরেও পেট খালি মনে হওয়া।
প্রচণ্ড পরিশ্রান্ত ও দুর্বল বোধ করা: কোনো ভারী কাজ না করলেও সবসময় শরীরে শক্তির অভাব হওয়া।
চোখে ঝাপসা দেখা: কাছের বা দূরের জিনিস হঠাৎ ঘোলাটে বা অস্পষ্ট মনে হওয়া।
ক্ষত সহজে না শুকানো: শরীরের কোথাও কেটে গেলে, ছিলে গেলে বা ঘা হলে তা সহজে ভালো না হওয়া।
হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া: কোনো ডায়েট বা ডায়েট প্ল্যান ছাড়াই শরীরের ওজন দ্রুত হ্রাস পাওয়া।
হাত-পা অবশ বা ঝিনঝিন করা: হাত ও পায়ের পাতায় অবশ ভাব, অবশ অনুভূতি বা সুই ফোটার মতো সুড়সুড়ি লাগা।
👁 ৬৫