Written by RajDoc Editorial Contributors
Reviewed by Dr. Sadia Sharmin Sultanaগর্ভাবস্থা প্রতিটি নারীর জীবনের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে হরমোনের নানা পরিবর্তনের কারণে শরীরে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে, যার মধ্যে অন্যতম একটি হলো গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা 'জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস মেলাইটাস' (GDM)। গর্ভাবস্থায় রক্তে সুগারের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বলা হয়। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে এই সমস্যার প্রকোপ আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের প্রতি ১০০ জন গর্ভবতী নারীর মধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ নারী এই জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকির কারণসমূহ
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস যেকোনো গর্ভবতী নারীরই হতে পারে, তবে কিছু নির্দিষ্ট কারণে এর ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। যেমন:
গর্ভধারণের পূর্বে বা গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত স্থূলতা বা ওজনের সমস্যা থাকলে।
পরিবারের নিকটাত্মীয়, যেমন—বাবা-মা বা ভাই-বোনের ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে।
পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম (PCOS), হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা হাইপোথাইরয়েডিজমের মতো পূর্ববর্তী শারীরিক সমস্যা থাকলে।
চিকিৎসার প্রয়োজনে দীর্ঘদিন ধরে ওভুলেশন বাড়ানোর ওষুধ কিংবা স্টেরয়েড জাতীয় কোনো ওষুধ সেবন করলে।
রোগ নির্ণয় ও স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রথম ধাপ হলো সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করা। গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে (ফাস্ট ট্রাইমেস্টার) নিয়মিত এন্টিনেটাল চেকআপের অংশ হিসেবে ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং করা অত্যন্ত জরুরি। এই রোগ নির্ণয়ের জন্য বিশ্বজুড়ে OGTT (Oral Glucose Tolerance Test) পরীক্ষাটি করা হয়ে থাকে।
এই পরীক্ষার নিয়ম হলো, গর্ভবতী রোগীকে সারারাত খালি পেটে থাকার পর সকালে প্রথমে রক্ত ও ইউরিনের নমুনা দিতে হয়। এরপর রোগীকে ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ মিশ্রিত পানি পান করানো হয় এবং এর নির্দিষ্ট সময় পর পুনরায় পরীক্ষা করে রক্তে সুগারের সঠিক মাত্রাটি নিশ্চিত করা হয়।
মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য ঝুঁকি
রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে তা মা এবং গর্ভস্থ শিশু—উভয়ের জন্যই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
মায়ের ক্ষেত্রে জটিলতা: ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে গর্ভাবস্থায় মায়ের রক্তচাপ অতিরিক্ত বেড়ে গিয়ে প্রি-এক্লাম্পসিয়া বা মারাত্মক খিঁচুনি হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ২৫% বেড়ে যায়। এ ছাড়া মূত্রনালীর ইনফেকশন (UTI), জরায়ুতে অতিরিক্ত পানি জমার কারণে সময়ের আগেই প্রসবের ঝুঁকি (Pre-mature delivery) এবং প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ কিংবা ট্রমা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
শিশুর ক্ষেত্রে জটিলতা: মায়ের গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের কারণে শিশুর জন্মগত ত্রুটি বা কনজেনিটাল অ্যানোমালি নিয়ে জন্মানোর ঝুঁকি প্রায় ২০% বৃদ্ধি পায়, যার মধ্যে শিশুর মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশ না হওয়া কিংবা হার্টে ছিদ্র থাকার মতো জটিলতা অন্যতম। রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ ও অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে গর্ভস্থ শিশুর হঠাৎ মৃত্যু (Sudden Fetal Demise) পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া শিশু জন্মের পর জন্ডিসে আক্রান্ত হতে পারে এবং পরবর্তীতে বড় হয়ে তার নিজেরও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
করণীয় ও উপসংহার
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস একটি জটিল পরিস্থিতি হলেও সঠিক সময়ে সচেতনতা এবং সুচিকিৎসার মাধ্যমে এর অধিকাংশ ঝুঁকিই এড়িয়ে চলা সম্ভব। যেকোনো ধরনের বড় জটিলতা থেকে নিজেকে এবং অনাগত সন্তানকে নিরাপদ রাখতে প্রত্যেক গর্ভবতী মায়ের উচিত গর্ভাবস্থার শুরুতেই ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং করা। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত এন্টিনেটাল চেকআপ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমেই কেবল একটি সুস্থ ও নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব।
ভিডিও লিংক https://www.youtube.com/watch?v=zwdwOzvvJGs
এই পাতাটি ৪৬বার পড়া হয়েছে