আমরা প্রতিদিন সুস্থ থাকার জন্য কত কিছুই না করি—নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খাই, শরীরচর্চা করি। কিন্তু আমাদের শরীরের মতোই যে আমাদের মনও অসুস্থ হতে পারে, সে খবর আমরা ক'জন রাখি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রতি ৮ জনের মধ্যে ১ জন মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮৭০ মিলিয়ন মানুষ এই অদৃশ্য লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
আমাদের দেশ বাংলাদেশও এই পরিস্থিতির বাইরে নয়। জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১৮ জনেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অর্থাৎ শিশু-কিশোরদের মধ্যেও এই হার ক্রমশ বাড়ছে; প্রতি ১০০ জনে প্রায় ১২ জনেরও বেশি শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে।
এত বিশাল সংখ্যক মানুষ যে সমস্যায় ভুগছেন, সেই মানসিক রোগ আসলে কী? এর লক্ষণগুলোই বা কেমন এবং আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান কীভাবে এর সমাধান করে, তা জানা অত্যন্ত জরুরি।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রধান দুটি নির্দেশিকা—DSM-5 (Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders) এবং ICD-11-এর গাইডলাইন অনুযায়ী, মানসিক রোগ হলো নির্দিষ্ট কিছু লক্ষণের সমষ্টি। যখন কোনো ব্যক্তির নিচের চারটি মূল ক্ষেত্রে গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা দেখা দেয়, তখন তাকে মানসিক রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়:
চিন্তাভাবনা (Cognition): যৌক্তিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পাওয়া বা বাস্তবতার বাইরে চিন্তা করা।
আবেগ (Emotion): নিজের আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা।
অনুভূতি (Perception): চারপাশের পরিস্থিতিকে ভুলভাবে উপলব্ধি করা।
আচরণ (Behavior): অস্বাভাবিক বা ক্ষতিকর আচরণ করা।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, এই সমস্যাগুলো যখন একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্র কিংবা পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং তার দৈনন্দিন কার্যক্ষমতা নষ্ট করে, তখনই তা রোগ হিসেবে রূপ নেয়। চিকিৎসা নির্দেশিকা DSM-5-এ প্রায় ২২টি প্রধান ক্যাটাগরির অধীনে ১৫০টিরও বেশি মানসিক রোগের উল্লেখ রয়েছে।
শারীরিক রোগের যেমন নির্দিষ্ট লক্ষণ থাকে (যেমন: জ্বরের জন্য তাপমাত্রা বাড়া, কাশির জন্য বুকে কফ জমা), মানসিক রোগেরও তেমনি কিছু স্পষ্ট লক্ষণ থাকে। এর মধ্যে সাধারণ কিছু লক্ষণ হলো:
বিষণ্ণতা ও হতাশা: দীর্ঘ সময় ধরে মন খারাপ থাকা, কোনো কিছুতেই আনন্দ না পাওয়া।
ঘুমের ব্যাঘাত: অতিরিক্ত ঘুম হওয়া কিংবা তীব্র অনিদ্রা।
খুতখুঁতে স্বভাব ও সন্দেহ প্রবণতা: কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই চারপাশের মানুষকে বা পরিস্থিতিকে সন্দেহ করা।
ভীতি ও উদ্বেগ: মৃত্যুভীতি, অকারণ প্যানিক অ্যাটাক বা সবসময় তীব্র দুশ্চিন্তায় থাকা।
যৌন সমস্যা: মানসিক দূরবস্থার কারণে শারীরিক বা মানসিক যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া।
মাদকাসক্তি: মানসিক কষ্ট বা অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে ভুল পথে মাদকের আশ্রয় নেওয়া।
শিশু-কিশোরদের অতি চঞ্চলতা: পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে না পারা, অতিরিক্ত ছটফটে স্বভাব (যা অনেক সময় ADHD-এর লক্ষণ হতে পারে)।
অতীতের কুসংস্কার পেছনে ফেলে আধুনিক বিজ্ঞান এখন মানসিক রোগের অত্যন্ত কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গাইডলাইন অনুযায়ী একটি সমন্বিত পদ্ধতিতে এর চিকিৎসা করা হয়, যাকে বলা হয় বায়ো-সাইকো-সোশ্যাল অ্যাপ্রোচ। এটি মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত:
মানসিক রোগের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মস্তিষ্কের বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটার বা রাসায়নিক উপাদানের ভারসাম্যহীনতা। একজন অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (Psychiatrist) রোগীর অবস্থা বুঝে প্রয়োজনীয় ওষুধ বা মেডিসিন প্রয়োগের মাধ্যমে মস্তিষ্কের এই রাসায়নিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনেন।
সব মানসিক রোগের সমাধান কেবল ওষুধে হয় না। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি। একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা থেরাপিস্ট রোগীর সাথে কথা বলে তার অবদমিত কষ্ট, চিন্তার নেতিবাচক প্যাটার্ন পরিবর্তন এবং মানসিক চাপ মোকাবিলার কৌশল শিখিয়ে দেন।
মানসিক রোগের কারণে একজন মানুষ সমাজ ও পরিবার থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এই ধাপে রোগীর পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশকে উন্নত করা হয়। রোগীকে পুনরায় কর্মক্ষম করে তুলতে এবং সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে সোশ্যাল স্কিল ট্রেইনিং বা সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।
শারীরিক অসুস্থতার মতো মানসিক অসুস্থতাও অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। এটি কোনো পাপ, অভিশাপ বা চারিত্রিক দুর্বলতা নয়। তাই আপনার বা আপনার পরিচিত কারও মধ্যে মানসিক সমস্যার লক্ষণ দেখা দিলে লোকলজ্জার ভয়ে তা লুকিয়ে রাখবেন না। এভিডেন্স-বেসড (Evidence-based) বা বিজ্ঞানসম্মত গাইডলাইন অনুসরণকারী একজন অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসাই পারে একজন মানুষকে সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিতে।
তথ্যসূত্র: ডা. এম এম রানা, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (RajDoc)।
এই পাতাটি ৪১বার পড়া হয়েছে