সামাজিকতার আড়ালে অসামাজিক মানুষ
Share on

সামাজিকতার আড়ালে অসামাজিক মানুষ

আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের জীবনে অজান্তেই এক মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি করছে। এর ফলে সমাজে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, বিবাহবিচ্ছেদ এবং তীব্র হতাশা থেকে আত্মহত্যার মতো চরম আত্মঘাতী প্রবণতা। বিশেষ করে, শৈশবেই অতিরিক্ত মোবাইল ও স্ক্রিন টাইমের সংস্পর্শে আসায় শিশুদের স্বাভাবিক মস্তিকের বিকাশ এবং আচরণ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় এড়াতে ডিজিটাল আসক্তির লক্ষণগুলো সময়মতো চেনা এবং সঠিক সময়ে পেশাদার মানসিক সহায়তা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞ সাইকোলজিক্যাল কাউন্সিলরের গুরুত্বপূর্ণ মতামতের আলোকে এই আর্টিকেলে সমসাময়িক মানসিক সংকট এবং তা থেকে মুক্তির কার্যকর উপায়গুলো আলোচনা করা হলো।

১. মানসিক সমস্যা বোঝার উপায় এবং চিকিৎসকের ধরণ: মানসিক সমস্যার চিকিৎসায় সাইকিয়াট্রিস্ট এবং সাইকোলজিস্টদের ভূমিকা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাইকিয়াট্রিস্টরা মূলত এমবিবিএস ডিগ্রিধারী ডাক্তার যারা মানসিক রোগের জন্য ঔষধ প্রেসক্রাইব করতে পারেন, অন্যদিকে সাইকোলজিস্টরা কোনো ঔষধ ছাড়া কেবল থেরাপি বা কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে কথা বলে সমস্যার সমাধান করেন। সাধারণত কোনো মানুষের ঘুম বা খাওয়ার অভ্যাস অস্বাভাবিকভাবে বদলে গেলে, অহেতুক রাগ বা বিরক্তি বাড়লে এবং নিজের দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হওয়ার এই লক্ষণগুলো যদি টানা দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তবেই বুঝতে হবে যে তার জরুরি মানসিক বা সাইকোলজিক্যাল সহায়তা প্রয়োজন।

২. সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব ও পারিবারিক সংকট: অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার বর্তমান সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য ও পারিবারিক জীবনে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনছে। ফেসবুকের কারণে মানুষের মধ্যে অবাস্তব সামাজিক তুলনা ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয় তৈরি হচ্ছে, আবার ইনস্টাগ্রামে অন্যদের কৃত্রিম বা ফিল্টার করা নিখুঁত জীবন দেখে নিজের প্রতি হীনমন্যতা ও বিষণ্ণতা বাড়ছে। এছাড়া টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মের তীব্র আসক্তি এবং সাইবার বুলিং পারিবারিক জীবনে চরম দূরত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করছে, যা মানুষকে একপর্যায়ে অতিরিক্ত একাকীত্ব ও আত্মহত্যার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত করে।

৩. শিশুদের মানসিক বিকাশ ও স্ক্রিন টাইমের ক্ষতি: শিশুদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে মোবাইল আসক্তি বা অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম অত্যন্ত আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে। জন্মের পর প্রথম তিন বছর শিশুর ব্রেন ডেভেলপমেন্টের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, অথচ এই সময়ে স্ক্রিনের অতিরিক্ত ও দ্রুত পরিবর্তনশীল উদ্দীপনা শিশুর শরীরে কর্টিসল হরমোন বাড়িয়ে তীব্র মানসিক চাপ তৈরি করে। এটি সরাসরি ব্রেনের 'ফ্রন্টাল লোভ' অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা শিশুর ভবিষ্যৎ সামাজিক আচরণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, বিচারবুদ্ধি এবং প্রবলেম সলভিং ক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে নষ্ট করে তাকে অতিরিক্ত জেদি ও হাইপারঅ্যাক্টিভ করে তোলে।

৪. অঞ্চলভেদে মানসিক সমস্যা এবং তা থেকে মুক্তির উপায়: ভৌগোলিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে মানুষের মানসিক সমস্যার ধরনে ভিন্নতা দেখা যায়; যেমন রাজশাহীতে ক্যারিয়ার, পড়াশোনা ও সম্পর্কজনিত উদ্বেগ (অ্যাংজাইটি) বেশি, ময়মনসিংহে দারিদ্র্যজনিত পারিবারিক কলহ এবং ঢাকায় অতিরিক্ত ব্যস্ততার কারণে মানসিক স্ট্রেস বেশি দেখা যায়। এই সমস্ত মানসিক সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে রুটিনমাফিক জীবনযাপন, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পাশাপাশি নিজ ধর্ম অনুযায়ী নিয়মিত প্রার্থনা করা উচিত। একই সাথে ভার্চুয়াল জগৎ ছেড়ে বাস্তব জীবনে ইতিবাচক মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং নিজের সুরক্ষায় একটি স্বাস্থ্যকর সীমারেখা বজায় রেখে 'না' বলতে শেখা মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

সরাসরি ভিডিও দেখুন https://www.youtube.com/watch?v=SyGP8Ds5VX8

এই পাতাটি ৫১বার পড়া হয়েছে

স্বাস্থ্য প্রবন্ধ