লিভার ক্যানসার এর কারন, লক্ষন ও চিকিৎসা

বাংলাদেশে ক্যান্সার জনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ লিভার ক্যান্সার। আর এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য পুরুষদের ক্ষেত্রে, যাদের বেলায় এটি তৃতীয় প্রধান ঘাতক ক্যান্সার। সাধারণত মানুষ ৫৫ থেকে ৬০ বছর বয়সে লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। অথচ বাংলাদেশের বেলায় লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার গড় বয়স মাত্র ৩৫-৪৫ বছর। অর্থাৎ এদেশে একজন মানুষ তার জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সময়টাতেই এই গুরুব্যাধিতে আক্রান্ত হবার ঝুঁকিতে থাকেন।

আমাদের দেশে লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস। এদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় চল্লিশ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে ইনফেকটেড হয়েছেন। এদের অনেকেই ভবিষ্যতে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকিতে আছেন। কাজেই এটি খুবই স্বাভাবিক যে, বাংলাদেশে লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত শতকরা প্রায় সত্তর জন রোগী হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত।

হেপাটাইটিস বি এর পরে আছে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস আর ফ্যাটি লিভার। প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ হেপাটইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত।

আর অন্যদিকে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের ‘ফ্যাটি লিভারের রাজধানী’। জন্মগতভাবে আমাদের এই উপমহাদেশের মানুষের লিভারে চর্বি জমার আশংকা বেশি। এমনকি শিশুরাও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। আর এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সেদেশে ফ্যাটি লিভারের রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। কারণ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি জীবন করে বিলাসবহুল, জীবিকা করে প্রতিযোগিতামূলক আর খাবারের অভ্যাসে আনে আমুল পরিবর্তন। সব মিলিয়ে আমাদের দেশে ফ্যাটি লিভার তাই ঘরে ঘরে।

লিভার ক্যান্সারের প্রকারভেদ বা শ্রেনিবিভাগঃ
লিভার ক্যান্সার ৪প্রকার-
১. হেপাটোসেলুলার কারসিনোমা
২. কোলাঞ্জিও কারসিনোমা
৩. হেপাটোব্লাস্টোমা
৪. এঞ্জিওসারকোমা

কারনঃ
হেপাটইটিস বি ভাইরাস, হেপাটইটিস সি ভাইরাস, ফ্যাটি লিভার, লিভার সিরোসিস, মেটাবোলিক ডিজিজ, এল্কোহোলিক এবং নন এলকোহলিক লিভার ডিজিজ, লিভার ফ্লুক্স, জেনেটিক কারনেও লিভার ক্যান্সার হয়ে থাকে।

লক্ষণঃ
পেটে ব্যাথা হওয়া , পেট ফুলে থাকা ,রক্ত বমি হওয়া, রক্ত পায়খানা হওয়া , খাবারে রুচি না থাকা, ওজন কমে যাওয়া ।

প্রতিকারঃ
-ভাইরাসের টিকা দিতে হবে।
-হেপাটাইটিস সি ভাইরাস রক্তের মাধ্যমে ছড়ায় তাই যখন রক্তদান বা ইঞ্জেকশন নিবেন তখন নতুন সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত দিতে বা নিতে হবে।
-সচেতনতার মাধ্যমে লিভার ক্যান্সার থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

লিভার ক্যান্সারের চিকিৎসা পদ্ধতি:
লিভার ক্যান্সারের অন্যতম এবং প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতিই হলো সার্জারি। বড় টিউমারের ক্ষেত্রে লিভার সার্জারি সবচেয়ে সফল ও নিরাপদ। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোনো কোনো রোগীর বয়স এবং অন্যান্য রক্তের প্যারামিটারগুলো সুবিধা জনক অবস্থানে না থাকায় সার্জারি সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে অন্যান্য পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়।
লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট : এটা আধুনিক চিকিৎসার এক বিপ্লবী মাইলফলক। বর্তমানে বাংলাদেশে সফলভাবে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হয় এবং এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বিশেষ করে লিভার ক্যান্সার এবং সিরোটিক লিভারের রোগীদের সফলভাবে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট এ দেশেই সম্পন্ন হয়েছে।

আরএফএ / রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এব্লেশন : এটা অত্যাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির অন্যতম এক সফল সংযোজন। এই চিকিৎসা পদ্ধতি এখন দেশে ব্যাপক সমাদৃত। এর মূল কারণ হচ্ছে- আমাদের দেশের লিভার ক্যান্সারের রোগীরা যখন যখন ডাক্তারের কাছে যায় তাদের ক্যান্সারের টিউমারটা অনেক বড় হয়ে যায়। দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রেই সার্জারিও সম্ভব হয় না। তখন দুই থেকে তিনবার অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে একবারই এই চিকিৎসা পদ্ধতিই প্রয়োগ করলে লিভার টিউমারের মধ্যে যে ক্যান্সার সেলগুলো থাকে বা কোষগুলো থাকে তা মেরে ফেলা সম্ভব হয়।

টেইস/ ট্রান্স আরটারিয়াল কেমোএম্বলাইজেশন : এটা অত্যন্ত সফল এক চিকিৎসা পদ্ধতি। এটা আমাদের দেশে এখনো সম্ভব হয়নি। পৃথিবীর উন্নত দেশসমূহে বর্তমানে এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় ছোট মাল্টিপল টিউমার ক্যান্সারের ক্ষেত্রে। লিভার ক্যান্সারের চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো যে কোনো একটি প্রয়োগ করার পরে এবং আগে রিসেন্ট ডেভেলপমেন্টে বেশকিছু কার্যকর ওরাল মেডিসিন এখন বাজারে প্রচলিত। যা টিউমার ক্যান্সারে রক্ত সঞ্চালনকে কমিয়ে দেয় এবং ক্যান্সারের কার্যকারিতাকে অনেকাংশে ক্ষীণ করে ফেলে।

ডা: রেবেকা সুলতানা
এমবিবিএস, এমডি(প্যাথলজি), সিসিডি(বারডেম)

এই পাতাটি ৬৫বার পড়া হয়েছে

স্বাস্থ্য প্রবন্ধ